নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য
রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রয়ের সহিত যেইভাবে পুলিশের একটি চক্রের যুক্ত হইবার খবর জনসমক্ষে সমুপন্থিত, উহা দ্বিগুণ উদ্বেগের। এমনিতেই নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ক্রয়-বিক্রয় জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। সেইখানে পুলিশের ন্যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এহেন অপকর্মে সংশ্লিষ্ট থাকিবার বিষয় অধিকতর উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানতম দায়িত্ব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ; তৎসহিত গোপনীয়তা রক্ষা। যখন সেই বাহিনীরই কতিপয় সদস্য অর্থের লোভে নাগরিকদের অতি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য অসাধু চক্রের নিকট তুলিয়া দেন, উহা জনমনে কতটা আস্থা ও নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে– বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনমতে, পুলিশের সরকারি ই-মেইল ও ভুয়া মামলার জিডি নম্বর ব্যবহার করিয়া কীভাবে একটি চক্র নাগরিকদের এনআইডি, মোবাইল সিমের লোকেশন, কল ডিটেইল রেকর্ড-সিডিআর, এমনকি পাসপোর্টের ন্যায় স্পর্শকাতর তথ্য কালোবাজারে বিক্রয় করিয়াছেন।
আমরা জানি, দেশের চারটি মোবাইল ফোন অপারেটরের ১৯ কোটির অধিক গ্রাহক রহিয়াছেন। ফোনে সকলের কল ও খুদেবার্তার তথ্য সংরক্ষণ করিয়া থাকে মোবাইল অপারেটরগুলি, যাহা সিডিআরে জমা থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ পায়। প্রযুক্তির এই যুগে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নহে, বরং তাঁহার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার সহিত যুক্ত। দেশের নাগরিকদের সিডিআর কিংবা অবস্থানগত তথ্য অসাধু চক্রের হস্তে পড়িলে ব্ল্যাকমেইলিং, অপহরণ, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেনস্তাসহ সকল অপরাধের দ্বার উন্মুক্ত হইয়া যায়।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিকের তথ্য বিক্রয়ের অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিবার কারণে পুলিশের সদস্য-চতুষ্টয়কে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। এই আশঙ্কা অমূলক হইতে পারে না– উহা নিমজ্জিত হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়ামাত্র। আমরা মনে করি, চারজন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তই শেষ কথা নহে। ইহার সহিত আরও কেহ সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে কিনা, তাহা অনুসন্ধান করিতে হইবে। এই প্রশ্নও অসংগত নহে, সরকারি ইমেইল এবং সিডিআর সংগ্রহের ন্যায় অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তার এত ঘাটতি কেন? কেন এই ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি ও প্রটোকল নাই?
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশসহ যেই সকল রাষ্ট্রীয় সংস্থা নাগরিকদের তথ্য ব্যবহারের ক্ষমতা রাখে, সেইখানে তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে দ্বি-স্তরবিশিষ্ট অনুমোদন, তৎসহিত ডিজিটাল লগ বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। এইখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা কিংবা গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকিয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক, যাহাতে ভবিষ্যতে কেহ এহেন অপরাধে সংশ্লিষ্ট হইবার দুঃসাহস না পায়। অধিকন্তু ডার্কওয়েব, সামাজিক মাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে সক্রিয় সাইবার অপরাধী চক্র তথ্য ক্রয়-বিক্রয়ে যুক্ত, তাহাদের চিহ্নিত করিয়া স্থায়ীভাবে নেটওয়ার্ক ভাঙিয়া দিতে হইবে।
প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উহা নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবার বিকল্প নাই। ইহার সহিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্ব পালনে প্রশিক্ষণই শুধু নহে; নৈতিকতার সবক প্রদানও অত্যাবশ্যক, যাহাতে রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়