ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অস্ত্রোপচারের অপ্রতুলতা

দৃষ্টিহীনে আলো দাও

দৃষ্টিহীনে আলো দাও
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে চক্ষুর ছানি রোগের বিস্তার ব্যাপক আকারে ঘটিলেও উহার অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা অপ্রতুল। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষমাণ। আরও উদ্বেগজনক, প্রতি বৎসর নূতন করিয়া যুক্ত হইতেছেন লক্ষাধিক চক্ষু রোগী। অথচ দেশে ছানি অস্ত্রোপচারে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ সার্জনের সংখ্যা এক সহস্রেরও নিম্নে। অপেক্ষমাণ রোগীর হিসাবে গড়ে ৮৩৩ জনের বিপরীতে রয়েছেন একজন দক্ষ সার্জন। যেইখানে অন্ধত্বের প্রায় ৮০ শতাংশই ছানির কারণে হইয়া থাকে, সেইখানে এই পরিসংখ্যান হতাশাজনক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

চক্ষুর ছানি অস্ত্রোপচার ও সহজ চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু সময়মতো অস্ত্রোপচার না হইলে অন্ধত্বের কারণ হইতে পারে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া সময়মতো চিকিৎসা না লইবার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দৃষ্টিহীনতার অভিশাপে নিপতিত হন। এই ক্ষেত্রে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতাও অস্বীকারের সুযোগ নাই। বস্তুত এই সংকটের কারণ কেবল চিকিৎসকের ঘাটতিতেই সীমাবদ্ধ নহে। কাঠামোগত দুর্বলতা ও সামাজিক বৈষম্যও দায়ী।

আমরা জানি, দেশে চিকিৎসা সেবার বৃহৎ অংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। তৎকারণে দূরদূরান্ত হইতে রোগীরা ঢাকায় আসিয়া থাকেন। সমকালের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতি দিবসে তিন-চার সহস্র রোগীর চাপ সামলাইতে হইতেছে। ইহার পরও গ্রামের ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশই সামাজিক সচেতনতার অভাব ও যাতায়াত ব্যয়ের কারণে চিকিৎসাসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন। 

আমরা মনে করি, ছানি রোগীদের অস্ত্রোপচার নিশ্চিতকরণে যদ্রূপ মানুষকে সচেতন করিতে হইবে, তদ্রূপ এহেন চিকিৎসা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছাইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। অনুরূপভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দিবারও বিকল্প নাই। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলাইয়া বৎসরে সাড়ে তিন হইতে চার লক্ষ রোগীর ছানি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা রহিয়াছে। এই সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করিলে ধীরে ধীরে সংকট হইতে উত্তরণ সম্ভব। 

যেহেতু প্রতি বৎসর নূতন নূতন ছানি রোগী যুক্ত হইতেছেন, তৎকারণে পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত অস্ত্রোপচার করিয়া পাঁচ-ছয় বৎসরের মধ্যে পুরাতন রোগীর চাপ হ্রাস করা সম্ভব হইবে। তজ্জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হইতে বাহির হইয়া জেলা হাসপাতালগুলিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়া সক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে হইবে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্ব কেবল ব্যক্তির জন্য নহে, সমগ্র সমাজের জন্যই বোঝা। অন্ধত্বের অভিশাপ হইতে সমাজকে রক্ষা করিতে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায় তথা সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা শিবির স্থাপন করিয়া তথাকার ছানি রোগীর সংখ্যা নিরূপণ সম্ভব। এই ধরনের শিবির অনেক সামাজিক সংগঠন ও দানবীরের সহায়তায় পরিচালিত হয় বটে, উহা পরিকল্পিত হইলে অধিকতর আশাব্যঞ্জক ফল দিতে পারে।

ইতিবাচক বিষয়, জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০ অনুযায়ী গত দুই দশকে অন্ধত্ব নিরসনে বৃহৎ সাফল্য আসিয়াছে। অন্ধত্বের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পাইয়াছে। তবে চিকিৎসাযোগ্য অন্ধত্বের বোঝা এখনও বৃহৎ সংকটরূপে দেশবাসীর সম্মুখে সমুপস্থিত। ছানি অস্ত্রোপচার প্রতি বৎসর অতিরিক্ত অন্তত দুই লক্ষ নিশ্চিত করিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হইবে। তজ্জন্য স্বাস্থ্য প্রশাসনকে আগাইয়া আসিতে হইবে। বিপুলা সুন্দর এই পৃথিবী দর্শনের মাধ্যম যেই চক্ষু, উহা সুরক্ষার আয়োজনে আর অবহেলা নহে।

আরও পড়ুন

×