ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

মুখোমুখি অবাধ্য সত্য

সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ প্রয়াস জরুরি

সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ প্রয়াস জরুরি
×

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

গত কয়েক বছর ধরেই আমরা বাংলাদেশে বেশ কিছু অদ্ভুত ধরনের অপরাধকর্ম দেখতে পাচ্ছি। সাধারণত, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ, নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও মাদক প্রবণতা থেকে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু অপরাধ আছে, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি। সনাতনি সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিক সমাজের দিকে উত্তরণের ক্রান্তিকালীন দ্বন্দ্ব থেকেই মূলত এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আমরা সনাতনি সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিক সমাজে উত্তরণ করলেও এখনও সেই সমাজব্যবস্থার অনেক প্রথা ও মূল্যবোধ লালন করছি। এর পাশাপাশি হঠাৎ আমাদের দেশে আধুনিকতার উপজাত হিসেবে আগত বেশকিছু মূল্যবোধ বা প্রথা দ্বারাও তাড়িত হচ্ছি। ব্যাপক অর্থে আমাদের সমাজ একটি জটিল সময় পার করছে। কেননা, এ সময়ে ঔপনিবেশিক, সামন্তবাদী ও সনাতনি সমাজব্যবস্থার উপাদানের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ও উত্তর আধুনিক সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
পাশ্চাত্যের নগর বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব ও আধুনিকায়নের ফলে সৃষ্ট সমাজে যে অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয়েছিল; বিংশ শতাব্দীতে এসেও তার অস্তিত্ব দেখতে পাই। যেহেতু আমাদের সমাজব্যবস্থা আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে, সেহেতু এর থেকে উত্তরণ ঘটানো সহজ কোনো ব্যাপার নয়। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, তাহলে এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তন বা সমাজ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, তা কি মেনে নিতে হবে? বিষয়টি একেবারেই সে রকম নয়। পাশ্চাত্যের আধুনিক সমাজ বিশ্নেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা থেকে উত্তরণ ঘটাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতর থেকে নানা ধরনের 'পলিসি'র সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। এর একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার সাধন। সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের মধ্য থেকে মানুষ যেমন এসব অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছে, তেমনি রাষ্ট্র নতুন নতুন আইন তৈরি করে এবং তা প্রয়োগে নতুন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে এ সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগী হয়েছে। কাজেই এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে অবশ্যই সমাজ ও রাষ্ট্র- এ দুই জায়গা থেকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দুই. অতি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অপরাধবিষয়ক সংবাদ আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি সংবাদের বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। এ তিনটি সংবাদই গত ১৪ আগস্ট সমকালের প্রথম ও দ্বিতীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটির শিরোনাম- 'চারঘাটে ভাতিজার হাঁসুয়ার কোপে চাচা খুন'। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের সম্পত্তিকেন্দ্রিক বিরোধ এই প্রথম নয়। সামাজিক পরিবর্তন, সমাজের উত্তরণ, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে সম্পত্তি, জমি-জমার মূল্য গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর ফলে পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সব জায়গায় সম্পত্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব আগের তুলনায় অনেক প্রকট। অন্যদিকে সামাজিক বিধিব্যবস্থায় নগরায়ন হলেও নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা-ভদ্রতা এবং আইনের শাসনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ নেই বললেই চলে। অর্থাৎ, আধুনিক সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় আমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করলেও মনোজগতে সনাতনি চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ ঠিকই রয়ে গেছে। ফলে আমাদের মধ্যে প্রবৃত্তির যে হিংস্র রূপটি সক্রিয়, তা আমরা মাঝেমধ্যে এ ধরনের ভয়ংকর অপরাধকর্মের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করি।
দ্বিতীয় সংবাদটির শিরোনাম- 'বালিশচাপায় শিশু হত্যার ১৯ দিন পর আয়া গ্রেপ্তার'। খবরে বলা হয়েছে- সিলেটে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসে আড়াই মাসের এক এতিম শিশুকে বিছানা থেকে ছুড়ে ফেলার পর বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শিশুদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আয়া সুলতানা ফেরদৌসী সিদ্দিকা গত ২২ জুলাই রাতে শিশুটিকে এভাবে হত্যা করে। আমরা জানি, সমাজব্যবস্থার উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিকীকরণের সনাতনি মাধ্যমগুলোর কার্যকারিতা বহুলাংশে হ্রাস পাচ্ছে। ব্যস্ততার কারণে পিতা-মাতা সন্তানদের দেখভাল করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে পাশ্চাত্যের জীবনব্যবস্থার মতোই আমাদের দেশেও রাষ্ট্র ও সমাজ কর্তৃক ডে-কেয়ার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের ঘটনাও তারই একটি দৃষ্টান্ত। উত্তরকালীন সমাজে আধুনিক সমাজব্যবস্থা ও সনাতনি মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ সিলেটের এ ঘটনায় আমরা দেখি। এ ঘটনা বিশ্নেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, ডে কেয়ারে সেবাদানে নিয়োজিত সেই আয়াকে সেবাদানের জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করা হয়নি। তার মধ্যে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মানসিকতার কতটুকু বিকাশ ঘটিয়ে তাকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থাকা অমূলক নয়। সনাতনি মন-মানসিকতা নিয়ে এবং দায়িত্বানুভূতি না থাকার কারণে সেই আয়া সনাতনি আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। হয়তো সে ভেবেছিল, তার এ আচরণ কেউ দেখছে না এবং সহজেই পার পেয়ে যাবে।

তৃতীয় সংবাদটির শিরোনাম- 'চকবাজারে পরিকল্পিত খুন :ফুটেজ দেখার পরও গাড়িচালকের বিরুদ্ধে মামলা পুলিশের'। ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে আমরা এর বেশ কয়েকটি দিক দেখতে পাই। প্রথমত, যত সহজে একটি শিশুকে একটি চলন্ত গাড়ির নিচে ছুড়ে ফেলা হলো, তা কোনো আধুনিক নগরবাদে উদ্বুদ্ধ এবং আইনের শাসনের প্রতি অনুগত মানুষের কাজ হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজের উন্নতি ঘটেছে বটে, কিন্তু পুলিশি ব্যবস্থা যে সনাতনিই রয়ে গেছে- এ ঘটনাটি তাও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কেননা, পুলিশের খাতায় এ ঘটনা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রতীয়মান। ঘটনার পর সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিকে প্রশ্ন করলে তাদের কেউই জবাবদিহিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাননি। তৃতীয়ত, এ ঘটনায় 'ডিস্ট্রিবিউটিভ জাস্টিস'-এর অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। অর্থাৎ, সমাজব্যবস্থায় আমরা আধুনিকায়নের মূল্যবোধ দ্বারা তাড়িত হলেও এখনও সমাজে অসমতা ও উঁচুনিচু ভেদাভেদ রয়েছে। সন্দেহ নেই যে, অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের কারণে তার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অশুভ আঁতাত রয়েছে। যে কারণে একটি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার পরও অপরাধী নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি।
তিন. মাঝেমধ্যে সুধীজন আমাকে প্রশ্ন করেন, আমাদের এ সংকট কতদিন চলবে? আমি তাদের বলি, আমার কাছে কোনো আলাদিনের চেরাগ নেই যে, চট করে এর উত্তর দিয়ে দেব। তবে, পাশ্চাত্যের উত্তরকালীন সমাজ বিশ্নেষণ করলে এটা পরিস্কার- উত্তরকালীন সমাজ ব্যবস্থা একশ থেকে দুইশ বছরও চলতে পারে। শিল্প বিপ্লবের আদি পর্বে যুক্তরাজ্যের প্রধান প্রধান শিল্প শহরে আমরা ভবঘুরে, পতিতাবৃত্তি, চুরি, ছিনতাই, শিশুশ্রম ও হত্যার মতো নির্মম অপরাধের সঙ্গে পরিচিত হই। অন্যদিকে আমেরিকায় শিল্প বিপ্লব, নগর বিপ্লব ও অভিবাসনের ফলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের উপস্থিতি লক্ষ্য করি। পাশ্চাত্যের সমাজ কিন্তু তাদের ক্রান্তিকালীন সংকট সমাধানের চেষ্টা করেছে। তারা নানাভাবে এর সমাধান করেছে।
আমাদেরও সময় এসেছে অপরাধপ্রবণতাকে উপলব্ধি করে নতুন নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করার। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এ ধরনের সংকট সমাধানের চেষ্টা না করব, ততক্ষণ এই ক্রান্তিলগ্নের সমস্যা নিয়েই বসবাস করতে হবে। যত দ্রুত নতুন নতুন আইন করা যাবে, সনাতনি প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন করা যাবে, তত দ্রুতই সমাধান মিলবে। দুঃখের বিষয় হলো- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বা নতুন প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি খুবই ধীরগতিতে হচ্ছে। একদিকে গবেষণার প্রবল অনুপস্থিতি, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী বা পলিসি বডিতে এক্সপার্টদের অন্তর্ভুক্তি না করায় আমরা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে নিত্যনতুন বিভিন্ন অপরাধকর্মের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণ ঘটানো খুব অস্বাভাবিক নয়।
দুটি জায়গা থেকে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা গেলে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার, নতুন নতুন আইন তৈরি ও সেগুলোর প্রয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এ ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরণ সম্ভব।
সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×