ভিন্নমত
এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে...
রুমিন ফারহানা
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০
গত বাজেট অধিবেশনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে আমার একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দিক থেকে যৌক্তিক জবাব না পেলেও অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তি-আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, সরকারি ও তথাকথিত বিরোধী দল, দুই তরফেই এক অদ্ভুত যুক্তি উঠে এসেছে। তারা সমস্বরে বলেছেন, স্কুল খোলার দাবি তারা সংসদে উঠিয়েছেন, যাদের সন্তান নেই। যুক্তিটি যে কেবল অসার তাই নয়, হাস্যকরও বটে। তার মানে এই দাঁড়াল, এখন থেকে অপরাধের শিকার না হলে এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না!
শুধু সংসদে নয়, সংসদের বাইরে ও শিক্ষামন্ত্রী কিংবা সরকারের অন্য প্রতিনিধিরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে উপর্যুপরি প্রশ্নের জবাবে কখনও সদুত্তর দিতে পারেননি। যখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা এসেছে; বারবার ছাত্র-শিক্ষকদের টিকা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলা হয়েছিল। সমকালে আমার আগের কলামটিতে দেখিয়েছিলাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য টিকা দেওয়া কোনোভাবেই শর্ত হতে পারে না। টিকা দেওয়ার সর্বনিম্ন যে বয়স ১৮, সেটাও যদি নিশ্চিত করা যায় তবুও দেশের প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া সম্ভব না। তাদের সবার বয়স বাই ডিফল্ট ১৮-এর নিচে।
উন্নত দেশগুলো তো বটেই, আমাদের আশপাশের সব দেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দফায় দফায় খুলেছে বা বন্ধ করেছে। কিন্তু আমরা খুলিনি একবারও। করোনা মোকাবিলায় অত্যন্ত সতর্কতামূলকভাবে মানুষের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে অর্থনীতির চাকা চালু রাখার নামে সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছে- রেস্টুরেন্টে খেতে গেছে, শপিংয়ে গেছে, বিনোদন কেন্দ্রে বেড়াতে গেছে।
শুধু সেটাই নয়, অর্থনীতিকে যখন সবকিছু খুলে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তখন সেই প্রশ্ন শিক্ষাক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল। দেশের নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কিন্ডারগার্টেনে অসংখ্য শিক্ষক কর্মরত। শিক্ষার জন্য অপরিহার্য আনুষঙ্গিক বইপত্র এবং স্টেশনারির দোকান আছে হাজারো। এসব দোকানের মালিক-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার মিলে নির্ভরশীল জনসংখ্যা কয়েক লাখ। আছে এসব পণ্যের আমদানিকারক। এই ব্যবসার আকারও ছোট না কোনোক্রমেই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু থাকলে শিক্ষকরা এবং এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত উপার্জন করতে পারলে সেটা তার জীবনের সংকট সমাধান করত। একই সঙ্গে সেটা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভোগকে বাড়িয়ে অন্যান্য ব্যবসা এবং শিল্পের জন্য চাহিদা তৈরি করত। এভাবেই খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ত অর্থনীতিতে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারের প্রতিষ্ঠান না খোলার সিদ্ধান্তের অসারতা মানুষ প্রতিদিন দেখেছে। সামাজিক মাধ্যম ভরে গেছে এ সংক্রান্ত নানা ট্রলে- করোনার সব জীবাণু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে কিনা; সেখানে জীবাণুরা বিএ-এমএ পাস করে বেরোবে কিনা ইত্যাদি কথার চাষ এখন নানা মহলে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা নিয়ে বক্তব্যের যাবতীয় অসংলগ্নতা সংসদে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পর আমি বলেছিলাম, একটা কানাঘুষা আছে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে সরকার ছাত্রদের দিক থেকে আন্দোলনের ভয় করছে। অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সরকারটি সারাক্ষণ যেহেতু ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত থাকে, তাই এমন ভয় পাওয়া খুবই যৌক্তিক। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, ভ্যাট আন্দোলনসহ নিকট অতীতে হওয়া সব অরাজনৈতিক আন্দোলন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- ছাত্রদের শক্তি কতটুকু। শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হলো- আমি ভুল ছিলাম না।
গত ২৭ আগস্ট ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, 'অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে। আপনাদের আটঘাট বেঁধে নামতে হবে। অনেক অপশক্তি এবার মাঠে নামবে, চ্যালেঞ্জ করবে। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই তারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। শেখ হাসিনার সরকারকে হটানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।'
সংবাদে জনাব কাদেরের বক্তব্য পড়ে আমার মনে প্রথমেই ভেসে উঠল এ বাক্যটি- 'এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে'। দীর্ঘ দেড়টি বছর এ দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের চরম সংকট তৈরি করে, তাদের জীবনে আরও নানামুখী সমস্যার কারণ হয়ে, লাখো শিক্ষার্থীর অকালে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার কারণ হয়ে সরকার শুধু তার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়নি। অথচ শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব বড় একটা অংশ নিজেরা ভোটার আর শিক্ষার্থীদের পরিবার মানে হচ্ছে এ দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এ দেশের প্রতিটি ভোটের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা জড়িত। শুধু নির্বাচনে ভোটের ভয় করলেও কি সরকার এমন মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে নিতে পারত?
সরকার যদি এই ভয় পায়- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে এবং তাতে যদি কোনো ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কিছু ঘটে; সেটা থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী তো আছেই। তারাই তো দায়িত্ব পালন করবে এ ক্ষেত্রে। ছাত্রলীগকে আটঘাট বেঁধে নামতে বলার কারণ কী তাহলে?
করোনার সময়ে সরকারের চরম ব্যর্থতা ছাড়াও সরকারি ব্যর্থতা আছে আরও নানা দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের এসব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পীঠস্থান। ছাত্রলীগকে আসলে ব্যবহার করা হবে এসব আন্দোলন যাতে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা যায়, সে জন্য। এই কলাম যখন লিখছি, তখনই দেখলাম ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি; নেমে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের মিছিলে হামলা চালিয়েছে।
এটাই বাংলাদেশ, যেখানে একজন অত্যন্ত সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী রাজনৈতিক নেতা এমন অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক এবং বেআইনি পদক্ষেপের জন্য আহ্বান করতে পারেন প্রকাশ্যে।
সংসদ সদস্য, আইনজীবী ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- ভিন্নমত
- রুমিন ফারহানা
