ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

শিশুর প্রতি সহিংসতা

শিশুর প্রতি সহিংসতা
×

জয়শ্রী দাস

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৪:১৭

মহামারি করোনার কারণে প্রায় ১৮ মাস ধরে স্কুলে যেতে পারছে না শিশুরা। বাইরে খেলাধুলা বা আনন্দ-বিনোদনও করতে পারছে না। এদিকে পরিবারের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে কর্মহীন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অস্থিরতা বেশি। ফলে শিশুদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে। করোনার প্রাদুর্ভাব এখন নিম্নমুখী। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে হয়তো নির্যাতন কিছুটা কমে আসবে।

যারা শিশু নির্যাতন করছে, তারা কি শিশু বয়সটা পার করে আসেনি? তাদের নিশ্চয় শিশুদের আবদার, আবেগ-অনুভূতি বোঝার কথা। পারিবারিক বিভিন্ন কারণে মানসিকতা হয়তো অনেকের ঠিক থাকে না। তাই বলে কোনো বিষয় নিয়ে পরিবারের ছোট মানুষটির সঙ্গে মতবিরোধ হবে, নির্যাতন করবে; এমনটি মোটেও কাম্য নয়। এ অবস্থায় মাথা গরম না করে আদর-সোহাগ দিয়ে বুঝিয়ে বলা যে কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা ভবিষ্যৎ গঠনের প্রাথমিক শিক্ষাও বলা চলে।

আমরা অনেকেই শিক্ষা অর্জন করছি। শিক্ষা মানুষের রুচির পরিবর্তন করতে বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের মানসিকতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে উন্নত মূল্যবোধের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে ঠিক, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের চর্চায় কতজনের উন্নতি হয়েছে কিংবা হচ্ছে? সমাজের সর্বত্র যদি তা-ই হতো তাহলে শ্নীলতাহানিসহ নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ত না।

সম্প্রতি সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা গেল, করোনার সময় শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ও এর ভয়াবহতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে- চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৯৯টি। খুন হয়েছে ৩৬৫ শিশু। ২০২০ সালে একই সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ছিল ৯৮৬টি। ২০১৯ সালে ঘটেছিল দুই হাজার ১৮৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা, যা আগের বছর ছিল এক হাজার ৫৩২টি। এমনটি শুধু দুঃখজনক নয়, একই সঙ্গে প্রশ্নবোধকও।

শিশুরা ভয়ংকর নির্মমতার শিকার হলে মিডিয়ার কল্যাণে সবাই জানতে পারে। ভয়াবহ ঘটনাগুলোর বাইরে যে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু ঘরে-বাইরে নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করছে, সে খবর কে রাখে? বিশেষ করে শিশুশ্রমিক, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, প্রতিষ্ঠানে বসবাসকারী শিশুসহ অনেক শিশু তাদের অবস্থানের কারণে অতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে শিশুর প্রতি নৃশংসতা। এমনকি অনেক বিকৃত মানসিকতার লোক নিজের সন্তানের ক্ষতি করে প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টায়ও পিছপা হয় না। এমন মানসিকতার পরিবর্তন করতে পারিবারিকভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে দেশে কঠিন আইন আছে। কিন্তু কঠোর আইনই যে শুধু অপরাধ দমনে যথেষ্ট নয়, তা আমাদের বাস্তবতায় দেখা যায়। সমাজ অপরাধপ্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে যত কঠোর আইনই থাক, শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো বড় ধরনের সংকট দূর করা অসম্ভব। ফলে শিশু ও অভিভাবকদের আতঙ্ক যেমন বাড়ছে, তেমনি এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। বর্তমানে এ সামাজিক ব্যাধি যেহেতু ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সেহেতু এর হাত থেকে পরিত্রাণে করণীয় নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবারের পাশাপাশি সমাজকেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা আমাদের দেশে বেশি লক্ষ্য করা যায়। বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিকৃত মানসিকতার কারণেই শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। নির্যাতন কমাতে হলে সবার জন্য একটি কার্যকর শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

গবেষক

আরও পড়ুন

×