ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

শৃঙ্খলার নামে নৈরাজ্য

শৃঙ্খলার নামে নৈরাজ্য
×

সুদীপ্ত সাইফুল

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০

ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি প্রভৃতি কারণে সড়কে প্রায়ই ঝরছে প্রাণ। কোনোভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কের নির্মাণ কৌশল সঠিক নয়। ফলে সড়ক-মহাসড়কগুলো অনেক বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। এসব সড়কে যদি অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল করে তাহলে দুর্ঘটনার মাত্রা কেমন হতে পারে, সহজেই অনুমেয়।
অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের মধ্যে নছিমন, করিমন, আলমসাধু, ভটভটি কিংবা শ্যালো মেশিনের ইঞ্জিনচালিত গাড়ি এবং মন্থর গতির থ্রি হুইলার তথা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশা ও ভ্যান উল্লেখযোগ্য। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে জানা যায়, সড়কে মোট যানবাহনের ১৮ শতাংশই নছিমন-করিমন-ভটভটি। এসব পরিবহনকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি করে আসছিল যাত্রীসাধারণ। সড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি উচ্চ আদালত এসব অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেন। আদালতের নির্দেশনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এসব যানবাহনের উৎপাদন, বিপণন কিংবা চলাচল কোনোটিই বন্ধ করা যায়নি। ফলে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে, সঙ্গে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও।
নছিমন-করিমন-ভটভটির অবাধ চলাচলে দুর্ঘটনার পাশাপাশি যানজটও তৈরি হয়। ইঞ্জিনচালিত ও ত্রুটিযুক্ত এসব পরিবহন অবৈধ হলেও দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় চলছে। এসব যানবাহনের কোনো লাইসেন্স, রুট পারমিট বা বৈধ কাগজপত্র নেই। ভয়ংকর এসব যানবাহন কখন যে কার ওপর উঠে যায়, কখন অন্য গাড়িকে ধাক্কা দেয়- তার ঠিক নেই। এসব গাড়িতে স্বস্তিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পেরেছেন এমন যাত্রীর সন্ধান মেলা ভার।
এ অবস্থায় জীবিকা রক্ষার যুক্তিতে সরকারি উদ্যোগে এসব যানবাহনকে বৈধতা দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বিশৃঙ্খল সড়ককে আরও ভয়ংকর করে তুলবে কিনা, সে বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশাকেও নিবন্ধন দেওয়া হবে। কারিগরি মানোন্নয়নের শর্তে এলাকা ও সড়কভেদে এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যক যানবাহন চলতে পারবে। এসব বিধান রেখে 'থ্রি হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০২১'-এর খসড়া করা হয়েছে বলে সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সমকালকে বলেছেন, 'সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে চালকদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাত্রীদের সুরক্ষায় গাড়ির নকশাও অনুমোদিত হতে হবে। মহাসড়কে চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে পারলে বরং দুর্ঘটনা কমবে।' বিআরটিএর মতে, সারাদেশে ১৫ লাখ নছিমন-করিমন-ভটভটি চলছে। যখন উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এমনকি জরিমানা করে অবৈধ নছিমন-করিমনের চলাচল বন্ধ করা যায়নি; সড়কে ফিটনেসবিহীন হাজারো গাড়ি চলছে; অনেক পরিবহন ও চালকের লাইসেন্স নেই; এ ছাড়া সড়কে চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ নৈরাজ্য যখন বিদ্যমান, সেগুলো সমাধানে তৎপর না হয়ে উপরন্তু এই বিপুলসংখ্যক অবৈধ থ্রি হুইলারকে বৈধতা দিয়ে তাদের লাইসেন্স নিশ্চিত করা, নকশা পরিবর্তন এবং নতুন করে মহাসড়কে এসব পরিবহনের চলাচল বন্ধ করার যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, তা অনেকটাই দিবাস্বপ্নের মতো; একেবারেই অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত। এসব পরিবহনকে বৈধতা দেওয়া হলে রাতারাতি এগুলোর সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। সড়ক আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে, নৈরাজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে- এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
আমরা জানি, অগভীর নলকূপের জন্য তৈরি ইঞ্জিন দিয়ে চালিত এসব পরিবহন শুধু সড়কের বিপদের কারণই নয়; পরিবেশ এবং শব্দদূষণেরও কারণ। এ ছাড়া এ ধরনের পরিবহন পরিচালনায় শিশুদের ব্যবহার করা হয়। বলা যায়, এ ধরনের পরিবহন শিশুশ্রমকে উৎসাহিত করে থাকে। কাজেই জীবিকা রক্ষার অজুহাতে এসব পরিবহনকে বৈধতা দেওয়া হলে তা হবে আত্মঘাতী। এ ক্ষেত্রে যাত্রীসাধারণ এবং বিশেষজ্ঞ মহলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কাজেই এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বরং বর্তমানে সড়ক-মহাসড়কে যেসব অবৈধ নছিমন-করিমন-ভটভটি এবং ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন পরিবহন চলাচল করছে সেগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেদিকে সরকারের গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×