ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

শিক্ষার্থীদের গণপরিবহন ভাড়া হোক অভিন্ন নিয়মে

শিক্ষার্থীদের গণপরিবহন ভাড়া হোক অভিন্ন নিয়মে
×

এস এম নাজের হোসাইন

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থী ও তরুণদের অনন্য ভূমিকা আমাদের জানা। আন্দোলনের মুখে রাজধানীতে পরিহনে অর্ধেক ভাড়া চালু হলেও ঢাকার বাইরে গণপরিবহনে বর্ধিত ভাড়া দিয়েই শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যাতায়াত করছেন। অনেক পরিবারের পক্ষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে বিআরটিসি কার্যালয়ে বাস ডিপো ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, 'আমি এই মুহূর্ত থেকে নির্দেশ দিচ্ছি, বিআরটিসির পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহনেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেওয়া হবে। যারা তা নেবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' মন্ত্রীর ওই ঘোষণার পরও বিষয়টি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দেশব্যাপী আন্দোলনে তাদের ৯ দফা দাবির অন্যতম দাবি ছিল, ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সে সময়ই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী একটি খসড়া গণপরিবহন আইন অনুমোদন করলেও সেখানে অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায়ই গণপরিবহন শ্রমিকদের হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়ে আসছে। অথচ গণপরিবহন মালিকরা বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার নিয়ম অনুসারেই ভাড়া নিচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরা। বাস্তবে এর অমিল মেলে অনেক ক্ষেত্রেই। সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়ার পর গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় বর্ধিত ভাড়াও। এ যেন রীতিমতো 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। দরিদ্র, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া নিয়ে সারাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

ডিজেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানোর পর পরিবহন মালিকদের চাপে সরকার বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ায়। এর পর থেকেই গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার দাবিতে ফের আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকার সড়কে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থী ও একজন সংবাদমাধ্যমকর্মী নিহত হওয়ার পর সে আন্দোলন আরও গতি পায়। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১ ডিসেম্বর থেকে বিআরটিসির বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর ঘোষণা করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির বাসের সংখ্যা ঢাকার যাত্রী সংখ্যার তুলনায় নগণ্য। বেসরকারি গণপরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকিসহ নানা সুবিধার শর্ত জুড়ে দেন। ঢাকায় গণপরিবহনে শেষ পর্যন্ত অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। তাদের বক্তব্য ছিল, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নিতে গেলে তাদের বড় লোকসান গুনতে হবে। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার এ দাবি নতুন নয়। আইডি কার্ড থাকলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হতো। কিন্তু কখনোই তা আইনি কাঠামোতে আসেনি।

১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা যে ১১ দফা দাবি দিয়েছিলেন, তার প্রথম দফাতেই বিষয়টি এসেছিল। ১ (ঢ) দফায় বলা হয়েছিল, "ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের 'আইডেন্টিটি কার্ড' দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ 'কন্সেসনে' টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও 'কন্সেসন' দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যে কোনো স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ 'কন্সেসন' দিতে হইবে। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে।" ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও অর্ধেক ভাড়ার দাবিটি ছিল। বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার পর সূচিত ওই আন্দোলনে ৯টি দাবির সপ্তম দফায় বলা হয়েছিল- 'শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।' বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দাবি না মানলে আবার রাস্তায় নামার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের প্রশ-, অর্ধেক ভাড়া তাদের অধিকার। অনেক আগে থেকেই এটা চলমান ছিল। তাহলে কেন সারাদেশে তা মানা হবে না?

কেবল ভারত ও পাকিস্তান নয়; দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার মতো দেশেও শিক্ষার্থীরা গণপরিবহনে ভাড়ার ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে আসছেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতেরও সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সম্মেলনে সমিতির কেন্দ্রীয় নেতারা শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার দাবি নাকচ করে বলেছিলেন, 'বেসরকারি খাতে গাড়িতে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার কোনো প্রভিশন নেই। সেটি বিআরটিসিতে আছে।' রাস্তায় যে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মাসের খরচের ক্ষেত্রে সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্রদের কাছ থেকে জানা যায়, টিউশনি করতে সপ্তাহে পাঁচ দিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে এতদিন যে ভাড়া দিতে হতো, নতুন তালিকায় ভাড়া এর অনেক বেশি বাড়িয়ে আদায় করা হয়। টিউশনি করে অনেক কষ্টে শিক্ষার খরচ চালানো শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেই যদি একেক দিন এত টাকা খরচ করতে হয় তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়ায়? ওই ক'দিনে এভাবে কত টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলাচল করা বাসে সর্বনিম্ন ৫ টাকা ভাড়া দিতে বলেছে শিক্ষার্থীদের।

অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন, বাসে উঠলেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দিতে হয়েছে। আগে থেকেই তারা ভাড়া বেশি নিত। সুযোগে অজুহাত দেখিয়ে আরও বেশি নিয়েছে। ঢাকায় এর অবসান হলেও ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় চলছেই। সন্তান এভাবে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে অভিভাবকের দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ বাড়ে। বেসরকারি এক চাকরিজীবীর তিন সন্তান কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। মাস খরচের হিসাবটা তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কি সে অনুপাতে বেড়েছে? মহামারির মধ্যে অনেকের চাকরি গেছে। অনেকেই কষ্ট সয়ে সন্তানদের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন। তাই গণপরিবহনে সারাদেশে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, অবরোধ ও আন্দোলনের যৌক্তিকতা স্বীকার করে অবিলম্বে এ দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সর্বত্র অর্ধেক ভাড়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার- এই প্রত্যাশা করি।

এস এম নাজের হোসাইন: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]

আরও পড়ুন

×