ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ভিন্নমত

এ কমিশন লইয়া কী করিব?

এ কমিশন লইয়া কী করিব?
×

রুমিন ফারহানা

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৪:৩৪

বিশ্বে বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানে নির্বাচনের সঙ্গে 'অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়। 'নির্বাচন' শব্দটিই স্বয়ংসম্পূূর্ণ। নির্বাচন মানেই অনেকের মধ্য থেকে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেওয়া, স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া। নির্বাচন মানেই সব দলমতের প্রার্থীদের সমানভাবে প্রচারণা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে বিষয়টি এত সরল নয়। এই যেমন,এখন চলছে ইউপি নির্বাচন। পাঁচ ধাপের এ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ মাত্র শেষ হলো। এটি স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ধাপ এবং এ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই নেই। অথচ এ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৪ জন, আহত সহস্রাধিক। অর্থাৎ যে কোনো মূল্যে জেতার যে মন্ত্র সরকারি দল গত কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করছে; স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তরের এ নির্বাচনও তার বাইরে রইল না।

নির্বাচন কী হবে- সেটা দেশের মানুষ যেমন জানে, তেমনি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমিও জানি। তারপরও রাজনৈতিক কর্মী বলেই হয়তো খুঁটিয়ে লক্ষ্য রাখছিলাম নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত কেমন থাকে নির্বাচনী পরিবেশ; কোন ভাষাতে চলে নির্বাচনী প্রচারণা। আমি যা দেখলাম তাতে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। সরকারি দলের কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় কেউ দেখাচ্ছেন একে-৪৭ এর ভয়, কেউবা ইঙ্গিত দিচ্ছেন নৌকায় ভোট না দিলে কী ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে সেদিকে। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাদুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হাবিবুর রহমান পবন নির্বাচনী সভায় বলেন, 'মাইন্ড ইট- নৌকার ভোট ওপেন হইতে হবে। এর বাইরে কোনো কথা নাই।' একে-৪৭ এর ভয় যে নির্বাচনে দেখানো যেতে পারে, সেটাও দেখলাম এ নির্বাচনে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'আমরা শুধু হুমাইপুরের জনগণের শক্তি নিয়ে ওই দিন আসব না। শুধু একে-৪৭ নয়; প্রয়োজনে যা করা দরকার সবই করব।'

মাদারীপুরের কালকিনির লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন মোল্লা নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতা বোঝাতে বললেন, 'এখনও সময় আছে, নৌকার পেছনে কারও মার-পুত নাই যে নৌকা পেছনে কেউ আইয়া বাধা দিবে।... আমি থাকব আমার কাছে দুইডা অস্ত্র লইয়া। দুইডা অস্ত্র লইয়া আমি থাকমু, কারও বাপ-পুত থাকলে আমার সামনে জানি আসে। দয়া কইরা নৌকার বিরুদ্ধে কেউ যাইয়েন না। নৌকার বিরুদ্ধে গেলে কারও বাঁচন নাই।' কী দারুণ প্রচারণা, তাই না? এ তো গেল জীবিত অবস্থায় আওয়ামী লীগে ভোট না দিলে কী হবে সে আলোচনা। কিন্তু কেউ কেউ আছেন যারা মৃত্যুর পর ভোটারদের কী পরিণতি হবে, সে ব্যাপারে পর্যন্ত সাবধান করেছেন। এই যেমন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও আসন্ন ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. শাহ আলম (সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ছোট ভাই) নির্দি্বধায় বলছেন, 'যারা যারা নৌকায় ভোট দেবেন না, তাদের চিহ্নিত করা হবে। সোজা কথা, আমার কবরস্থানে তাদের কবর দিতে দেওয়া হবে না। তাদের চৌধুরীপাড়া নিয়ে কবর দিতে হবে। এমনকি তাদের মসজিদেও নামাজ পড়তে দেওয়া হবে না।'

এর আগে এই বছরের ১৬ মার্চ, নির্বাচনী তপশিল ঘোষণা করার আগেই এক সভায় এই একই ব্যক্তি বলেন, 'সরকার কার? সরকার শেখ হাসিনার, নৌকাও সরকারের। ভোট জোর করে নিতে পারলে নৌকা মার্কার সরকার পারবে। চেয়ার মার্কা, কলসি মার্কার পক্ষে তা মোটেও সম্ভব না। সরকারি গুণ্ডারা কার? পুলিশ সরকারি গুণ্ডা, তারা (পুলিশ) হচ্ছে নৌকা মার্কার লোক। ভোট নিলে নৌকা মার্কার লোকজন নিতে পারবে, পিটিয়ে পিটিয়ে।'

এ তো গেল প্রচারণার ভয় দেখানো। শরীয়তপুরের চিতলিয়া ইউনিয়নে ঘটেছে অভিনব ঘটনা। এখানে ভয়ভীতি নয়, সরাসরি নির্দেশনা এসেছে- ইলেকশন নয়, সিলেকশন। এমনকি সে নির্দেশনা মানতে সই জালিয়াতি করতেও পিছপা নন সরকারি কর্মকর্তারা। শরীয়তপুরের চিতলিয়া ইউনিয়নের রিটার্নিং কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, 'এমপি স্যারের সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে চিতলিয়া ইউনিয়নে কোনো নির্বাচন হবে না। সবাই সিলেকশনে হবে।'

প্রশাসন যার পক্ষে তার আর ভয় কী? ঠিক তাই হয়েছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়ন পরিষদে। সেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মৃধা. মু. আক্তার উজ জামান ওরফে মিলন মৃধা প্রচারণায় বলেন, 'গত নির্বাচনে ওসি মাহবুব আমার ভোট কেটেছে। এবার আর সেই সুযোগ নাই। এবার ওসি-ইউএনও ভালো লোক, প্রশাসন আমার পক্ষে। গতবার আমি অসহায় ছিলাম, এবার আমি অসহায় নই।'

স্থানীয় নেতা আর প্রশাসন যখন এত এগিয়ে, তখন সংসদ সদস্যরা আর পিছিয়ে থাকেন কেন? পাবনার বেড়া পৌরসভা নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শামসুল হক টুকু বলেন, 'আমি মায়াদয়া করব না কিন্তু। পিষে দেব।' স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ধাপের নির্বাচনে যখন পিষে মারার হুমকি আসে, তখন সেই নির্বাচন নিয়ে বলার আর কী বা থাকতে পারে? ক্ষমতা বোঝাতে গিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগ সভাপতি রবিউল ইসলাম বলেন, '...আমি রবিউল, আমি কুষ্টিয়া জেলার মাস্তান, আমাকে কুষ্টিয়া জেলা মাস্তানির সার্টিফিকেট দিয়েছে। খোকসা থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত (জেলার দুই প্রান্ত) যত লোক আছে, মাস্তান আছে, আমার হাতে চলে।'

জীবন থাকতে পিষে মারার হুমকি, মাস্তানির সার্টিফিকেট, একে-৪৭ এর ব্যবহার; মৃত্যুর পর কবর না পাওয়ার হুমকিসহ যে নির্বাচনে ইতোমধ্যে ৭৪ জন মারা গেছেন, সেখানে সিইসি বলছেন, 'পুলিশ দিয়ে পাহারা দিয়ে এ-জাতীয় অপ্রীতিকর ঘটনা থামানো যায় না।' এ কথার পর 'এ কমিশন লইয়া আমি কী করিব' বলা ছাড়া আর কী বা বলার থাকে! বাংলাদেশের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে হাস্যাস্পদ করে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের যেমন দায় আছে, তেমনি সমান দায় আছে তথাকথিত নির্বাচন কমিশনের।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা: সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×