ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড

দিয়াকুলবাসীর অনন্য দৃষ্টান্ত

দিয়াকুলবাসীর অনন্য দৃষ্টান্ত
×

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

গত ২৩ ডিসেম্বর ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে মধ্যরাতে এমভি অভিযান-১০ নামে লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কতজন মারা গেছেন, এখন পর্যন্ত এর সঠিক তথ্য জানা যায়নি। ধারণা করি, যেহেতু বড় লঞ্চ তাই হয়তো হাজারখানেক যাত্রী ছিলেন। অতএব ক্ষতির মাত্রা যে ব্যাপক হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করতে কয়েকটি তদন্ত কমিটি করেছে সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ, যা প্রায় সব বড় দুর্ঘটনাতেই করা হয়ে থাকে। পরে অবশ্য জনসমক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় না। এর কারণ হলো কর্তব্য ও দায়িত্ববোধের অভাব। যেমন ওই লঞ্চে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ছিল, কিন্তু মালিক কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেননি, তা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। চালকের পরিবর্তে অপর একজন চালাচ্ছিল লঞ্চটি। নদীটি খুব প্রশস্ত নয়। আগুন লাগার কয়েক মিনিটের ভেতরেই তা কিনারে ভিড়তে পারত। তার পরিবর্তে ৪৫ মিনিট চলেছে ওই নৌযানটি। অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে মধ্যরাতে; দমকল এসেছে ভোরে। ৯৯৯-এ ফোন করে কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ শোনা গেছে।
পত্রিকা-টেলিভিশন খুললেই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর খবর মেলে প্রায় নিত্য। তার ভেতর অবাক লাগে, যখন দেখি ট্রেন ও সড়কযানের সঙ্গে ক্রসিংয়ে সংঘর্ষের সংবাদ। রেলের ইঞ্জিন তো তার লাইন ছেড়ে নেমে আসে না। অর্থাৎ রেলগেটের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। রেল বিভাগ রেলগেট যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করার কাজটি সম্পাদন করতে পারল না কেন- এর উত্তর সন্ধান করে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারচিত্র বিরল। লঞ্চের ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে, মামলা হয়েছে। অনেক লেখালেখি হচ্ছে। ভিআইপিরা যাচ্ছেন। আমার কাছে একটি পত্রিকার শিরোনাম অত্যন্ত আকর্ষণীয় লেগেছে। ওই খবরের শিরোনাম হলো- দিয়াকুলবাসী এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ত্রাতার ভূমিকায় ছিলেন। শীতের মধ্যরাতে দিয়াকুল গ্রামের মানুষ ছুটে এসেছেন। যে যেভাবে পারেন উদ্ধার কাজে এগিয়ে এসেছেন। জ্বলন্ত লঞ্চ থেকে শিশু উদ্ধার করেছেন। অনেকে নিজ গৃহে নিয়ে সিক্ত বসন পাল্টানোর ব্যবস্থা করেছেন। দমকল বাহিনী যে অনেক দেরিতে এসেছিল, সে কথা ওই লঞ্চের যাত্রী একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাও বলেছেন।
আমরা এবার স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সব গ্রামই হয়েছিল দিয়াকুল গ্রাম। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি, এক দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উল্লাপাড়া থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত ১৬ মাইল ঢাকা-উত্তরবঙ্গ হাইওয়ের দুই ধারে সব গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ নির্দেশ দিয়েছিলেন- হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেক্রেটারিয়েটসহ সব সরকারি, আধাসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। ২৬ তারিখের পর আস্তে আস্তে সব অফিস চালু হয়েছিল। আর এসব সরকারি অফিস থেকে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত করার জন্য শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। রাজাকার রিক্রুট করা হয়েছিল। তারা শুধু একের পর এক জনপদই পোড়ায়নি; নির্বিচারে গণহত্যাও চালিয়েছিল। উন্মুক্ত স্থানে মা-বোনদের ইজ্জত হরণ করেছিল। তার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানা ছিল গ্রামই। আমি ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সপরিবারে যমুনা নদী দিয়ে নৌকাপথে যাত্রা করি। পথিমধ্যে রাতে একটি চরে এক বাড়িতে আশ্রয় নিই। চারদিকে নদী; ঘোর অন্ধকার। ভদ্রলোক একজন কৃষক। রাতে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা তো করলেনই; একটি মাত্র শোবার ঘর আমাদের ছেড়ে দিয়ে নিজেরা রান্নাঘরে গেলেন। বিদায় নেওয়ার সময় কিছু টাকা দিতে গেলে জিভে কামড় দিয়ে বললেন, আপনারা দেশের জন্য কষ্ট করছেন, আমরা তো কিছুই করতে পারছি না। কী গভীর মমত্ববোধ দেশের প্রতি! আর একটি প্রশ্ন করলেন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে- বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন তো?
২৬ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা শহরে অপারেশন শুরু করলে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা শহর ছেড়ে যার যার বাড়ি অভিমুখে বা অন্য কোনো আশ্রয়ের সন্ধানে হেঁটেই রওনা দেয়। গাড়িঘোড়া নেই; চরণই একমাত্র ভরসা। আমি সে সময় সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানায় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের কাছেই এর অবস্থান। পরে যোগ দিই মুজিবনগর সরকারে। দেখেছি কীভাবে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে চিড়া-মুড়ি, গুড়-পানি সংগ্রহ করে মহাসড়কের ওপর বিশ্রামস্থল বানিয়ে ক্লান্ত পথচারীদের অপ্যায়ন করেছিল। কোনো রকম দুস্কর্মের কথা তখন শুনিনি। আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমে যায়। মোট কথা বলতে হয়, তারাও নিজ নিজ কর্মস্থলে বসেই সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু সে তুলনায় চুরি-ডাকাতি, হানাহানি মোটেই বাড়েনি। বরং অনেক কমেছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী শান্তি কমিটি গঠন করার পর অশান্তি বাড়তে থাকে। তা ছাড়া পাকিস্তান প্রশাসনের আদর্শ ছিল খুন, অগ্নিসংযোগ, লুট এবং ধর্ষণ।
আমাদের গ্রামবাংলার মানুষের আর একটি অনুভূতির ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। আমার বাড়ি নিভৃত পল্লিতে। গাইবান্ধা শহর থেকে ১০ মাইল দূরে। ১৯৫২ সালের কথা। গ্রামের স্কুলে পড়ি। দিনটি ছিল সাপ্তাহিক হাটের দিন। গ্রামের মানুষের যা কিছু কেনাবেচা, তা ওই হাটে হয়ে থাকে। ছাত্ররা এসে লোকজনকে বলল, ঢাকায় ছাত্ররা মাতৃভাষার দাবিতে মিছিল করলে পুলিশের গুলিতে ছাত্র মারা যায়। হাট না বসার অনুরোধ জানাল তারা এবং লোকজন সঙ্গে সঙ্গে হাটের স্থান পরিত্যাগ করে চলে গেল।
বঙ্গবন্ধু সব সময় বাংলার কৃষক-শ্রমিক মজুরের কথা বলতেন। তাদের সার্বিক মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে বলেছেন- 'আমার বাংলার কৃষক, মজুর, শ্রমিক দুর্নীতি করে না।' বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসরণ মানে গ্রামবাংলার মানুষের সার্বিক মুক্তি। দিয়াকুল গ্রামবাসী জানিয়ে দিল- তারা দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক। দিয়াকুলবাসী মুক্তিযুদ্ধে ও সর্বসাম্প্রতিক লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের দুর্যোগে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, তা অনুসরণীয় হয়ে থাকুক। এই দৃষ্টান্ত আমাদের কাঙ্ক্ষিত মানবিক সমাজ গঠনে বড় সহায়ক শক্তি হতে পারে।
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×