ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

টেলিযোগাযোগ

টেলিকম খাতে মধ্যস্বত্বভোগী বৃদ্ধির বিপদ

টেলিকম খাতে মধ্যস্বত্বভোগী বৃদ্ধির বিপদ
×

এস এম ফরহাদ

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

মোবাইল টেলিকম খাতে ক্রমশ নির্ভরশীলতা বাড়ছে। কথাটি দু'ভাবে বলা যায়। প্রথমত, মোবাইল ফোনের ওপর ব্যবহারকারীদের নির্ভরশীলতা দিন দিন বেশি করে বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, মোবাইল খাতই দিন দিন আরও বেশি করে পরনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এ লেখায় উভয় দিক নিয়েই আলোচনা করব।
প্রথমে আসা যাক মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে। এটা এখন আর নতুন বিষয় নয়। আমরা সবাই বুঝি, পাড়ার মুদিখানায়ও এখন মোবাইল ফোনে পণ্যের অর্ডার নিয়ে মালপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। ই-কমার্স ব্যবসায়ী, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক, বিমান কিংবা ট্রেনের টিকিট, বীমা কিংবা স্কুলের পড়াশোনা- ইন্টারনেটের সব সেবাই এখন মোবাইল ফোননির্ভর। সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস মহামারিতে ভ্যাকসিন প্রদানে বাংলাদেশ দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে যেখানে 'সুরক্ষা' অ্যাপের মাধ্যমে টিকাপ্রত্যাশীরা নিবন্ধন করতে পেরেছেন। এখন স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিকাদান কার্যক্রম চলছে। সেখানেও আমরা সফলতার মুখ দেখছি।
দেশের প্রতি ১০ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯ জনেরও বেশি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যোগাযোগ করেন। পকেটে একটি স্মার্টফোন থাকা মানেই দুনিয়া হাতের মুঠোয়। গাড়িতে চলা বা পার্কে হাঁটার সময়ও অনেকে এখন জুম মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন। এক ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তা জানালেন, 'কভিড-১৯ মহামারির পর থেকে যখন জুমে বোর্ড মিটিং শুরু হয় তখন থেকে তার ব্যাংকের সব বোর্ড মেম্বারকেই মিটিংয়ে পাওয়া যায়। এটা স্বাভাবিক সময়ে প্রায় অসম্ভব ছিল।'
আরেকটা জরিপে দেশের এক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তথ্য পেয়েছিলেন, ঢাকার সিংহভাগ রিকশাওয়ালা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাড়িতে টাকা পাঠান। এটা তৈরি পোশাক কিংবা আর সব পেশার লোকদের জন্যও একই গল্প বলে ধারণা করা যায়। তো মোবাইল ফোনের ওপর গ্রাহকদের এই নির্ভরশীলতার গল্প এখন আর নতুন নয়। বরং এই সেবাকে কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, সে আলোচনাই অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। দিন দিন নিত্যনতুন সুযোগ নিয়ে আসছে মোবাইল প্রযুক্তি আর বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে আমাদের কাজ অনেক বেশি সহজ করে দিচ্ছে।
এবার আসা যাক মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে। আমরা যদি একটু পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে তাকাই, সেখানে একটি টেলিকম কোম্পানি সাবমেরিন কেবল, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ), টাওয়ার, ট্রান্সমিশনসহ সব ধরনের সেবা দিতে পারে। অর্থাৎ একটি কোম্পানিকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কম হয়। আমরা জানি, মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা যত কম হবে কোম্পানির পরিচালন ব্যয় তত কম হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা একদম উল্টো। যত দিন গড়াচ্ছে মোবাইল টেলিকম খাতে তত বেশি মধ্যস্বত্বভোগীর প্রবেশ দেখা যাচ্ছে। এর সূত্রপাত হয় এক দশক আগে যখন প্রথম ট্রান্সমিশন লাইন থেকে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ক্ষমতা তুলে নেওয়া হলো। কয়েক হাজার কোটি টাকায় বসানো ফাইবার কেবল ছেড়ে দিতে হলো বাজারে আসা নতুন কোম্পানির হাতে। শুধু তাই নয়, মোবাইল অপারেটরদের হাতে এখন শুধু ভয়েস ও ইন্টারনেট ছাড়া আর কোনো সেবাদানের সুযোগ নেই। পরে যখন মোবাইল মানি এলো, সেখানেও মোবাইল খাতকে দূরে সরিয়ে রাখা হলো। যদিও এই সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সক্ষমতা তাদের ছিল।
গত আড়াই-তিন বছর ধরে দেশে নতুন করে নেটওয়ার্ক সাইট বসানো নিয়ে কঠিন সময় গেছে। কারণ টাওয়ার কোম্পানিগুলোর অপারেশনে আসতে দেরি হচ্ছিল। কভিডকালে দ্রুতই ডাটার চাহিদা বাড়তে থাকে। মোবাইল অপারেটরগুলো প্রাণান্ত চেষ্টা করে সেবা জারি রেখেছে।
এবার আসা যাক স্পেকট্রামের আলোচনায়। এটাও সবাই এখন অবগত। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ডাটা সেবার জন্য প্রচুর স্পেকট্রাম দরকার। সেখানেও আমরা পিছিয়ে আছি। সরকার যখনই স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিতে চেয়েছে তখনই অপারেটরগুলো তা ক্রয় করেছে। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে স্পেকট্রাম নিলামের পর সরকারের কাছে আর বিক্রয়যোগ্য স্পেকট্রাম অবশিষ্ট ছিল না। এখন আবার নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
পাশাপাশি এটাও স্মরণ করা দরকার, যেভাবে স্পেকট্রামের মূল্য ধরা হয়, তা মোটেও ব্যবসাবান্ধব নয়। এটা সত্য যে, নিলাম ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু নিলাম শুরুই করা হয় যে দাম থেকে, সেটা অত্যন্ত চড়া। বেশি মূল্যে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ফল কখনও ভালো হয় না। কারণ নেটওয়ার্কের যন্ত্রপাতির জন্য তখন আর অর্থ ব্যয় করার মতো অবস্থা থাকে না। আমাদের প্রত্যাশা, আগামীতে যখন তরঙ্গ বরাদ্দের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে; সরকার যেন যৌক্তিক হারে মূল্য নির্ধারণ করে।
ফোরজি সেবায় উৎকৃষ্ট মান পেতে হলে পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম ও রোবাস্ট ফাইবার কানেকটিভিটির কোনো বিকল্প নেই। আর সামনে যখন ফাইভজি সেবা চালু হবে তখন একদিকে এই দুইয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে নেটওয়ার্কিং সাইটের সংখ্যা।
তবে বিনিয়োগের পরিবেশের জন্য আরেকটা বড় নির্ভরশীলতার জায়গা হলো মোবাইল খাতের কর। কোম্পানির রাজস্বের অর্ধেকই যদি চলে যায় নানা ধরনের কর দিতে; তাহলে সেবা প্রদানে তার প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটররা আর সব খাতের চেয়ে বেশি কর দেয়। করপোরেট ট্যাক্স হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ আবার অলাভজনক কোম্পানির ক্ষেত্রে মোট আয়ের ২ শতাংশ। পাশাপাশি বিটিআরসিকে দিতে হয় মোট আয়ের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আমাদের মনে রাখা দরকার, এই সেবার ওপর নির্ভরশীল আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন কিংবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন।
স্পেকট্রাম ক্রয় আর কর দিতেই অপারেটরদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মোবাইল অপারেটর যত বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, তত বেশি উৎকৃষ্ট মানের সেবা প্রদান করতে পারবে। আর সরকার শুরুতেই যত বেশি আয় করতে চাইবে, তত বেশি প্রভাব পড়বে সেবার মানে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ : মহাসচিব, অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)

আরও পড়ুন

×