ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

দ্রব্যমূল্য

বাজারে সমন্বয়হীনতা ঘোচান, তদারকি বাড়ান

বাজারে সমন্বয়হীনতা ঘোচান, তদারকি বাড়ান
×

এস এম নাজের হোসাইন

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১৩:২৬

খোড় যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে- এ যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। গত কয়েক দিন ধরেই দফায় দফায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন করে বেড়েছে ডাল ও ডিমের দাম। এদিকে আমন ধান কাটা প্রায় শেষ হলেও চালের বাজারে সুখবর মিলছে না। সরকারি হিসাবেই মোটা চালের কেজি এখন ৪৮ টাকা। ফলে প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষ একটু ডাল-ভাত কিনে খাবে সে উপায়ও নেই। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে গত ডিসেম্বর মাসে মজুরির হার বেড়েছে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। আর মূল্যস্ম্ফীতি বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের আয় খেয়ে ফেলছে নিত্যপণ্যের দাম। করোনার কারণে কাজ হারিয়ে যারা ঋণগ্রস্ত, তাদের অনেকেই বাড়তি আয় করেও ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না।

গত এক সপ্তাহে অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি, ময়দা, মসুর ডালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। যেসব ব্যবসায়ীর মজুত ছিল তারাই লাভবান হয়েছেন। আর যাদের মজুত ছিল না, তাদের বেশি দামে কিনে, বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার ক্রমাগত অসহনীয় হয়ে উঠছে। ভরা মৌসুমেও শাকসবজির দাম সীমিত ও শ্রমজীবী মানুষের নাগালের বাইরে। শুধু কাঁচাবাজারই নয়, প্রায় সব জিনিসের দাম ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে গণপরিবহনে যাতায়াত খরচও বেড়েছে আগের তুলনায়। সামগ্রিকভাবে বাড়তি জীবন-জীবিকার খরচের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রান্তিক, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন চাহিদার তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে পুষ্টি সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বাজারে এক লাফে জিনিসের দাম বাড়ে অস্বাভাবিক হারে- এই অভিযোগ নতুন নয়। সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে পারছেন না কেন? অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি চলছেই দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত না হওয়ায়।

অর্থনীতিবিদের মতে, কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা আছে। কারণ করোনা মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক ধরনের শিল্প ও ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। করোনার ধাক্কা সামলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও সারাবিশ্বেই ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। হঠাৎ করে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। জাহাজসহ অন্যান্য পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। তবে এসব কারণে যতটুকু বাড়া উচিত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি বাড়িয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। আবার কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতাই নেই। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হলেও দেশে প্রায় সব নিত্যপণ্যই কমবেশি উৎপাদিত হয়। এ অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো নিত্যপণ্য আমদানি করা হলে বাজারে কোনো পণ্যের বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা থাকে না। পেঁয়াজ নিয়ে এত আলোচনার পর পেঁয়াজের উৎপাদনের ভরা মৌসুমে এখনও এ পণ্যের আমদানি উন্মুক্ত থাকা দুঃখজনক। সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করাও সম্ভব। এ ছাড়া দেশি পেঁয়াজের মৌসুমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। বাজারে পণ্যমূল্যে স্থিতিশীলতা রাখতে অসাধু ব্যবসায়ীদের শক্তির উৎস খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তা দিয়ে খুচরা বাজারে কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও এর সুফল মিলছে না। আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা বাজার কর্মকর্তা শুধু পাইকারি দোকানের বাজারদর সংগ্রহ করেন, যার সঙ্গে ভোক্তার সংশ্নিষ্টতা কম। যে কারণে ভোক্তা সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী দোকানে মূল্য তালিকা টানানোর নির্দেশনা আজ পর্যন্ত কার্যকর সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বা ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারের আমদানি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বাজার তদারকি বাড়ানো জরুরি। করোনাকালে যাদের আয় কমে গেছে, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে। গ্রাম ও শহরাঞ্চলের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ যাতে জীবনযাত্রা চালাতে পারে, সে জন্য নিত্যপণ্যের দাম যেমন স্থিতিশীল রাখা দরকার, তেমনি তাদের আয় বাড়ানো ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। আমদানিকারক, উৎপাদক, পরিবেশক, সরবরাহকারী, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, টিসিবি, সর্বোপরি ট্যারিফ কমিশন, কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

এস এম নাজের হোসাইন: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]

আরও পড়ুন

×