ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমাজ

অনিরাপদ খাদ্যের সঙ্গে বসবাস!

অনিরাপদ খাদ্যের সঙ্গে বসবাস!
×

এস এম নাজের হোসাইন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ডে দেশ খাদ্য উৎপাদনে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, এখনও সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশে খাদ্য ব্যবসায়ে জড়িত কিছু অতি মুনাফাকারী এবং ভেজালকারী চক্রের দৌরাত্ম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। খাদ্যে ভেজাল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নিত্য ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের আধিপত্যের কারণে দেশে ন্যায্য ব্যবসার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যে সুশাসনের ঘাটতিও ক্রমাগতই বাড়ছে। নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে অনেক ভোক্তাই সচেতন নন। কৃষক ও উৎপাদকের মাঠ বা খামার থেকে, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন, খাবার টেবিলে পরিবেশন পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে নিরাপদ খাবার নিশ্চিতকরণের বিধিবিধান অনুসরণ করা না হলে নিরাপদ খাদ্য ও অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ উন্নত আয়ের দেশে পরিণত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তা হতে হলে স্বাস্থ্যবান কর্মক্ষম জনশক্তির বিকল্প নেই। আর কর্মক্ষম জনশক্তির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকার এখন এ বিষয়ে মনোযোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং বিক্রয়কে 'দুর্নীতি' হিসেবে চিহ্নিত করে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্টও খাদ্য ভেজালকে দুর্নীতি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ হাজার ৭৭৬ জন মারা গেছেন। খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস ডালডা বা নিম্নমানের ভোজ্যতেল। এগুলো সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য, স্ন্যাকস, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খোলা জায়গায় খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকার 'নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩' প্রণয়ন করে ২০১৫ সালে 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ' প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়নসহ জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি, ভেজাল ও দূষণবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। ৬৪টি জেলা ও আটটি বিভাগীয় শহরে ৭৪টি নিরাপদ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন মেনে চলার জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তি প্রদান করছে। কিন্তু খাদ্যে ভেজালের মাত্রা কমানো যাচ্ছে না। যাদের যে অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে, পরের বার একই প্রতিষ্ঠান ঠিক একই অপরাধের জড়িত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, খাদ্যপণ্যে এই নৈরাজ্য ঠেকাতে জেলা প্রশাসন, খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের মূল অংশীজন হলো ভোক্তা। সরকারি নীতিনির্ধারণে এই ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য দূর করতেই হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নীতিনির্ধারণীতে ব্যবসায়ীদের আধিক্য থাকলেও ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব আমলে নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরগুলো সব সময় ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা উন্নয়নে নানা কর্মসূচি নিলেও ভোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও তাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে আগ্রহী নয়। ফলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবধান বেড়েই চলেছে। কর্তৃপক্ষ যদি ব্যবসায়ীনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে যাবতীয় নীতি প্রণীত হবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে যা খাদ্যপণ্যের বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় অন্তরায় হতে পারে এবং চলমান ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের বৈষম্যকে আরও উস্কে দেবে।
বর্তমান সরকার ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে 'রূপকল্প ২০৪১' বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার উন্নত প্রজাতির বীজ ও সেচের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ওপর ব্যাপক জোর দিয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস ও দুধের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্যের বহুমুখিতা এবং নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই। তাই নিরাপদ, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিতের দিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। পুষ্টিকর ও সুষম স্বাস্থ্যকর খাবার আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরিমিত শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, বিশুদ্ধ পানি, আঁশ জাতীয় খাবার নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিদিনের খাদ্যে শাকসবজি-ফলমূল রাখতে হবে।
দেশে নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকারসহ জনস্বার্থে অনেক আইন ও বিধিবিধান এবং কর্তৃপক্ষ থাকলেও আইন প্রয়োগ সব সময় সমভাবে হয় না। আইন প্রয়োগে স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রয়োগের ক্ষেত্রে রং বদলায়। সে কারণে আইন না মানার অপসংস্কৃতি বাড়ছে। সরকারদলীয় সংশ্নিষ্টতা, প্রভাবশালী ও বড় ব্যবসায়ীদের বেলায় আইনের প্রয়োগে শিথিলতায় আইন প্রয়োগ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু বাহারি ও চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে খাদ্যপণ্য ক্রয় করলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকছে; তার সতর্কতা অবলম্বনে ভোক্তাদের সচেতনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ভোক্তা ও কোমলমতি শিশুদের মধ্যে সচেতনতা বিকাশে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাঠ্যবইয়ে জাঙ্কফুডের মতো অনিরাপদ খাদ্যপণ্য, ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাহলে আজকের প্রজন্ম বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা হিসেবে তার অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি দায়িত্ববান হতে পারবে।
এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]

আরও পড়ুন

×