ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সুশান্তের জীবনের না বলা গল্প

সুশান্তের জীবনের না বলা গল্প
×

সমু সাহা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ০০:২১ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ০০:৪৩

চাঁদ, তারা, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র তাকে আর্কষণ করত। তাই সময় পেলেই বসে যেতেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেখতে। চাঁদের চিরঅন্ধকার দিকটি, অর্থাৎ যে অংশটি সবসময় পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকে, সেই দিকে 'মেয়ার মাস্কোভিয়েন্স' বা 'সি অব মাসকোভি' অংশে জমি কিনেছিলেন সুশান্ত সিং রাজপুত। ইন্টারন্যাশনাল লুনার ল্যান্ডস রেজিস্ট্রির কাছ থেকে এই জমি কিনেছিলেন সদ্য প্রয়াত এই অভিনেতা। ২০১৮-র ২৫ জুন তার নামে ওই ভূখণ্ড নথিভুক্ত হয়। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী পৃথিবীর বাইরে কোনো মহাজাগতিক অংশ কারও আইনি সম্পত্তি হতে পারবে না। বলিউডে সুশান্তই প্রথম নায়ক, যিনি চাঁদের জমি কিনেছেন। আর অন্যদিকে শাহরুখ খানকে চাঁদে একখণ্ড জমি উপহার দিয়েছেন তার এক ভক্ত অনুরাগী। রাতের আকাশের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল পদার্থবিজ্ঞানের এই মেধাবী ছাত্র সুশান্তর। ছিল অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ। সময় পেলেই চোখ রাখতেন তারাদের সংসারে।

ভক্তরা মজা করে বলতেন, সুশান্ত নাকি ওই ভাবে চাঁদের মাটিতে নিজের জমি দেখভাল করতেন! মহার্ঘ্য টেলিস্কোপ কেনার পর খুশি হয়েছিলেন বাচ্চা ছেলের মতোই। ইনস্টাগ্রামে সেই ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন 'এটা বিশ্বের আধুনিকতম টেলিস্কোপের মধ্যে অন্যতম। এবার বাড়ি থেকেই শনি গ্রহের বলয় দেখতে পাব।'

টেলিস্কোপে চোখ রেখে সময়-সফর করতেন সুশান্ত। শনির বলয়, বৃহস্পতির চাঁদ পেরিয়ে পাড়ি দিতেন অন্তহীন ছায়াপথ বেয়ে। তার ঘরের দেয়ালে আঁকা চাঁদে মানুষের প্রথম পা রাখার ছবি। অন্য এক দেয়ালে অন্য মহাকাশ অভিযানের ছবি। দেয়ালের গ্রাফিতিতে রয়েছে চাঁদের ষোলো কলাও। মহাকাশচারীর পোশাকে ঘুরে এসেছিলেন নাসার দপ্তরও। টেবিলে সাজানো থাকত মহাকাশযানের মডেল। কিন্তু কে জানত, সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকা ছেলেটির মনে জমেছে একরাশ অভিমান, হতাশা। যেজন্য নিজেই হয়ে গেলেন দূর আকাশের নক্ষত্র।

জীবনকে আকণ্ঠ পান করে ভালোবাসতেন স্বপ্নের আকাশে উড়তে। তাইতো তিনি কিনেছিলেন দুর্মূল্য ফ্লাইট স্টিমুলেটর। সাধারণত এই স্টিমুলেটর পাইলটদের প্রশিক্ষণের কাজে লাগানো হয়। গতির নেশা ছিল পথেও। তার কাছে ছিল মূল্যবান বিএমডব্লিউ কে ১৩০০ আর মোটরসাইকেল। পছন্দের বাহন ছিল বিলাসবহুল স্পোর্টসকার মাসেরাতি কোয়াত্রোপোর্তে এবং ল্যান্ডরোভার রেঞ্জ রোভার এসইউভি।

গত ১৪ জুন যখন তিনি পৃথিবীর সঙ্গে চূড়ান্ত অভিমান নিয়ে আত্মহত্যা করলেন, তখনও কেউ সেভাবে বিশ্বাসই করতে পারেননি। অভিনেতা অক্ষয় কুমারের টুইটে বিষয়টি যখন পরিষ্কার হওয়া গেল, ততক্ষণে পুরো বলিউড শোকে মুহ্যমান। সেই শোকের আবরণ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা লাখো সুশান্ত ভক্তের মনে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম... সব জায়গায় 'সুশান্ত' রব। বয়স মাত্র ৩৪। এই বয়সে তিনি কতটা মানুষের অন্তরে গেঁথে ছিলেন, তা কি একবারও আঁচ করতে পেরেছিলেন সুশান্ত। যদি পারতেন তাহলে হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না।

পাটনায় জন্ম হলেও পারিবারিক কারণে সুশান্তকে পাড়ি দিতে হয় দিল্লি। সেখানেই স্কুলজীবন শেষে দিল্লি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হন। পড়াশোনায় তুখোড় সুশান্ত ভৌতবিজ্ঞানে জাতীয় অলিম্পিয়াড জিতেছিলেন। ইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইনস মিলিয়ে মোট ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ১১টি প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ই অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। ২০০৫ সালে ৫১তম ফিল্মফেয়ার পুরস্তারে শ্যামক ডাভার ডান্স ট্রুপের ব্যাকগ্রাউন্ড ডান্সারের দলের অন্যতম ছিলেন সুশান্ত। এরপর নেসলের বিজ্ঞাপনের সুবাদে জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

সেখানে তাকে দেখে ২০০৮ সালে 'কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল' ধারাবাহিকে নেন প্রযোজক একতা কাপুর। এরপর 'পবিত্র রিস্তা'। এই ধারাবাহিকটি তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। এই ধারাবাহিক থেকেই বলিউডে পা রাখেন সুশান্ত। অভিনয় করেন 'কাই পো চে'। প্রথম ছবিতেই নিজের অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে দেন। এরপর 'পিকে', 'ডিটেক্টিভ ব্যোমকেশ বক্সি', 'শুদ্ধ দেশি রোমান্স' ও 'এমএস ধোনি, দ্য আনটোল্ড স্টোরি'তে ধোনির ভূমিকায় অভিনয় সুশান্তকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়।

২০১৭ সালে জন্মান্তরবাদ নিয়ে ছবি 'রাবতা' এবং ২০১৮ সালে হিমালয়ের সুনামির পটভূমিকায় নির্মিত 'কেদারনাথ' সেভাবে সফল না হলেও ২০১৯ সালে 'ছিছোড়ে' তাকে সাফল্য এনে দেয়। যদিও এই ছবিটি ম্যাসিভ হিট হয়নি।

গত সোমবার যখন শেষবারের মতো অকালে ঝরে যাওয়া তরুণটিকে বিদায় জানান বলিউডের সহশিল্পী, বন্ধুরা। তখন হচ্ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। কেউ কেউ বলছিলেন, প্রকৃতি তার নিজের সন্তানের শেষ বিদায় দিল চোখের জলে!

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সুশান্তকে নানাভাবে স্মরণ করেছেন বলিউডের নানা প্রজন্মের তারকারা। সুশান্তের সঙ্গে ছবি পোস্ট করে শাহরুখ খান লিখেছেন, 'ও আমাকে খুব পছন্দ করত। ওর অভাব আমরা সবাই বোধ করব। ওর এনার্জি, ওর হাসিমুখ, ওর চটপট কথা বলা এগুলো সহজে ভোলা যাবে না। ওর আত্মার শান্তি কামনা করছি।'

আনুশকা শর্মা লিখেছেন, 'আমি আজ দুঃখী। সুশান্ত এক তরুণ আর দুর্দান্ত অভিনেতার নাম। আমি শুধু একটা কথা ভেবেই চলেছি, যে মানসিক সংকটের ভেতর দিয়েই যাক না কেন, ও কারও কোনো সাহায্য পায়নি! এটা কেমন সময়?' জ্যাকলিন ফার্নান্দেজ লিখেছেন, 'এটা কী শুনলাম, সুশ! আমি কেবল এই চঞ্চল, পরিশ্রমী, উদ্যমী, হাসিখুশি, এনার্জিটিক, সেটে মজা করা সুশান্তকে মনে রাখতে চাই, সারা জীবন।' বরুণ ধাওয়ান লিখেছেন, 'সুশান্তের মতো গুণী আর পরিশ্রমী শিল্পী খুব কম জন্মে। আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।'

আরও পড়ুন

×