হিউম্যানয়েড ট্রেন্ড
নব্বই ভাগ মানবিক আবেগ রোবটে
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১১:৫০
চীনের ইউবিটেক এমন মানবসদৃশ সঙ্গী রোবট এনেছে, যা মানুষের আবেগ বুঝে কথা বলতে পারে। আগের কথাও মনে রাখতে পারে এবং একাকিত্বের সঙ্গী হতে পারদর্শী। কদিনের মধ্যেই কয়েক হাজার অর্ডার পেয়েছে এই রোবট নির্মাতা সংস্থা।
মানুষের মতো দেখতে, আবেগ বুঝতে পারে, কথা বলতে পারে, এমনকি একাকিত্বে সঙ্গীর শূন্যতা পূরণ করতে পারে– এতদিন যা শুধু কল্পকাহিনির অংশ ছিল, সেটিই এবার বাস্তবে নিয়ে এলো রোবট নির্মাতা সংস্থা ইউবিটেক।
কিছুদিন আগে শেনঝেনে সংস্থাটি উন্মোচন করেছে নতুন ইউওয়ার্ল্ড ইউওয়ান সিরিজের মানবসদৃশ সঙ্গী রোবট। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানো, কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া এবং আবেগ বুঝে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য তৈরি এই রোবট এরই মধ্যে টেক দুনিয়ায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটি বলছে, ইউওয়ার্ল্ড ইউওয়ান সিরিজের রোবটের জন্য এরই মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি প্রি-অর্ডার জমা পড়েছে।
সংস্থার পরিকল্পনা, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই প্রথম দফার সরবরাহ শুরু করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী মুখের গঠন, চুলের ধরন, পোশাক ও কণ্ঠস্বরের কিছু বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রিয় মানুষ বা পরিবারের সদস্যের চেহারার আদলেও এই রোবট তৈরি করা সম্ভব।
ইউবিটেক দাবি করেছে, এই রোবটের প্রধান আকর্ষণ এর মানবসদৃশ অবয়ব। শরীরে ব্যবহার করা হয়েছে নরম সিলিকনের ত্বক। এতে রয়েছে ৮৮টি চলন অক্ষ, যার সহায়তায় মানুষের ৯০ শতাংশ স্বাভাবিক নড়াচড়া অনুকরণ করতে পারে। বুকে কয়েকটি সেন্সর যন্ত্র, চোখে ক্যামেরা, মুখের অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি ও ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে মিলিয়ে কথা বলার ক্ষমতা একে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। পূর্ণ চার্জে এটি প্রায় দুই থেকে চার ঘণ্টা টানা কাজ করতে পারে। নির্মাতা বলছে, এটির ভেতরে ২০টির বেশি মানবিক আবেগ ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভুলতায় শনাক্ত করতে পারে।
জানা গেছে, চীনে ৯ কোটির বেশি প্রাপ্তবয়স্ক একা থাকেন। বলতে গেলে তারা একাকিত্বে ভোগেন। অন্যদিকে, ১১ কোটি ৮০ লাখ প্রবীণ তাদের সন্তানদের থেকে আলাদা থাকেন। তাদের একাকিত্বকে খানিকটা দূর করতেই এমন রোবট তৈরির পরিকল্পনা করেছে প্রযুক্তি নির্মাতা ইউবিটেক। অনেকের ভেতরে প্রশ্ন কাজ করে, আদতে রোবট কি মানুষের মতো সব কাজ করতে পারে? এই প্রশ্নটা বহু দিনের। চর্চাও হয় এ নিয়ে হরহামেশা। সারাবিশ্বে মানুষের বিকল্প হিসেবে রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। কোথাও রোবট পানীয় তৈরি করছে, কোথাও আবার মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ম্যারাথন দৌড়াচ্ছে। কেউ আবার অবলীলায় ইস্ত্রি করা জামাকাপড় ভাঁজ করে ফেলছে।
বিপণন বা বিজ্ঞাপনে রোবটকে নিয়ে কত কিছুই না বলা হচ্ছে। মানুষের মতো দেখতে রোবটের পোশাকি নাম হিউম্যানয়েড।
কিন্তু অনেক সময় মানুষের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। কিছুদিন আগে বোস্টনে অনুষ্ঠিত হয়েছে রোবটিকস সামিট। সারাবিশ্বের বেশ কিছু হিউম্যানয়েড রোবট এতে প্রদর্শিত হয়। সেখান থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে– এখনও রোবট মানুষের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে পাল্লা দিতে প্রস্তুত নয়।
হিউম্যানয়েডের কয়েকটি ব্রোশিয়ারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা অনেকাংশেই মেলেনি।
ইলন মাস্ক তাঁর অপ্টিমাস প্রটোটাইপের প্রদর্শন করেন। তাতে দেখা গেছে, এটি ছোট ছোট পা ফেলে জগিং করছে। এ ছাড়া ফিগার এআই উদ্ভাবিত তৃতীয় প্রজন্মের রোবট ফিগার জিরো থ্রি ঘর পরিপাটির কাজ করছে। ঘর পরিষ্কার করার কাজে এটি বেশ পারদর্শী। অন্যদিকে চীনের অ্যাজিবট ও ম্যাট্রিক্স রোবটিকস দাবি করেছে, তাদের তৈরি রোবট অতিথি আপ্যায়নে দক্ষ।
অনেক রোবট ইতোমধ্যে মেশিন থেকে তৈরি কফি পরিবেশন করেছে; অতিথিদের বাড়ির চারপাশ ঘুরিয়ে বর্ণনা করেছে। কিন্তু রোবট তৈরি করা বেশির ভাগ সংস্থাই বলছে, যেসব হিউম্যানয়েড রয়েছে, সেসবের বেশির ভাগই দূরনিয়ন্ত্রিত, তাদের কাজের একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্ধারণ করা রয়েছে। তার চেয়ে বেশি কোনো কাজ তারা করতে পারে না। নির্মাতারা বলছে, এই ছোট ছোট কাজ করার জন্যই এদের তৈরি করা হয়েছে। নিও রোবটের কথাই সামনে আনা যেতে পারে। গত অক্টোবরে ওয়ানএক্স সংস্থা এর বাণিজ্যিক উন্মোচন করে। সংস্থাটি রোবটের বিজ্ঞাপন তৈরিতে বলেছিল, এই রোবট বাড়ির সব কাজ করতে পারে। কিন্তু এটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে মানুষই।
সারাবিশ্বে রোবট তৈরির কাজ কিন্তু দাপিয়ে চলছে। হুন্ডাইয়ে বোস্টন ডায়নামিকসের অ্যাটলাস বা বিএমডব্লিউর কারখানায় হেক্সাগন রোবটিকসের ইয়নের পরীক্ষামূলক ব্যবহার চলছে। তবে এখনও এসব রোবট চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
সব মিলিয়ে রোবট ও মানুষের ভেতরে লড়াইটা কিন্তু উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে। গবেষকরা বলছেন, কে কাকে টপকে কখন এগিয়ে যাবে, এসব যুক্তিতর্ক সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়।