ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ভাঙছে নদী, অপরিকল্পিত খনন নিয়ে প্রশ্ন

ভাঙছে নদী, অপরিকল্পিত খনন নিয়ে প্রশ্ন
×

শেরপুর সদর উপজেলার কামারের চর ইউনিয়নের ৬ নম্বর চরের পশ্চিমপাড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন। সম্প্রতি তোলা ছবি: সমকাল

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১২:২২

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ভাঙনের শিকার হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র পারের মানুষ। এবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে নদের পারের মানুষের। বিআইডব্লিউটিএর অপরিকল্পিত খননের ফলে ভাঙন বেড়েছে বলে ধারণা অনেকের। ভাঙনের এ চিত্র শেরপুর সদর উপজেলার কামারের চর ইউনিয়নের ৬ নম্বর চরের পশ্চিমপাড়া এলাকার।

গত দুই-আড়াই বছরে ভাঙনকবলিত এলাকাটির বহু ঘরবাড়ি ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়েছে। ভাঙন থেকে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়দের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণের। কিন্তু স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে সেই দাবি গত ৪ দশকেও পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, যখনই ভাঙন তীব্র হয়; পানি উন্নয়ন বোর্ড সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারের কারসাজিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা পেরে না ওঠায় সেই কাজেও অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ায় নদীভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। তারা জানান, গত কয়েক বছরে অর্ধকোটি টাকার বেশি ব্যয় করার পরও মানসম্মত কাজ না হওয়ায় এ বছর ফের বালুর বস্তার নিচ দিয়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ভীষণ আতঙ্কে দিন পার করছেন নদী তীরের দেড় হাজারের অধিক পরিবার। তারা জানান, বর্তমানে যেভাবে নদীতীর ভাঙছে, তা অব্যাহত থাকলে কিছু দিনের মধ্যে নদী লোকালয়ে ঢুকে পড়বে।

দেড় বছর আগেও ৬ নম্বর চরের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন কৃষক মোহাম্মদ মণ্ডল, এফাজ মণ্ডল, রেহান আলী, দেলোয়োর হোসেন, লুৎফর রহমান, ছেবুগারাসহ দেড় শতাধিক পরিবার। ইতোমধ্যে ব্রহ্মপুত্র গিলে খেয়েছে তাদের ফসলি জমি, বসতভিটা। এখন ওই এলাকা ছেড়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে, কেউ নদীর পূর্বপাশে ফের বেঁধেছেন বসতঘর। ৩০-৪০টি পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে বালুর বাঁধের ওপর।

দরিদ্র কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঘরবাড়ি হারায়া বালুর বাঁধে আশ্রয় নিছি। নিজেদের সব শেষ। অহন নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে যে কোনো সময় বালুর বাঁধ নদীতে চলে যাবে। তখন আবার শুরু হবো আমগরে নতুন ঘর তুলার সংগ্রাম।’ তিনি জানান, নদী পারের মানুষের কান্নায় কারও মন গলে না। তাদের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা কেউ ভাবে না।

কথা হয় নদী ভাঙনের শিকার কৃষক রেহান আলী ও লুৎফর রহমানের সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, ৪ বছর আগেও বেশ ভালোই ছিলেন তারা। নদী ভাঙন এলাকায় চর ছিল। যখনই বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ) নদী খনন শুরু করে তখন থেকেই ভাঙন শুরু হয়। এখনও ভাঙন অব্যাহত আছে। তাদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বালুর বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ ঠিকমত হয়নি। বস্তা নিচে না দিয়ে ওপরে ফেলা হয়েছে। তাই ওই এলাকায় আবার ভাঙন দেখা দিয়েছে। যদি দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না যায় তাহলে নদী তীরের কয়েকশ ঘরবাড়ি, মাদ্রাসা, মসজিদ নদীগর্ভে চলে যাবে।

স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন, শুষ্ক মৌসুমে নদী শান্ত হয়ে এলে তাদের যন্ত্রণার কথা ঢাকা পড়ে যায়। বর্ষা এলে হইচই শুরু হয়। তখন দরদী লোকের সংখ্যা বেড়ে যায়। টনক নড়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের।

ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান কামারেরচরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে চরাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য, নদী পারের বাসিন্দাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। কিন্তু তাদের কষ্ট লাঘবে কিছুই করতে পারছেন না। তিনি বলেন, কয়েক বছরে বালুর বস্তা ফেলে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে নদী ভাঙন ঠেকাতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ওই অঞ্চলটি ৪-৫ বছর আগেও চর ছিল। নদী ভাঙন নিয়ে এতটা চিন্তা ছিল না। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে নদী খনন করে নাব্য ঠিক রাখার কাজ শুরু করলে ভাঙন বেড়ে যায়। অপরিকল্পিত নদী খননের ফলে এ অঞ্চল ভাঙন বেড়েছে বলে তাঁর ধারণা। নদীতে পানি দিন দিন বাড়ছে। আহাজারি করছে মানুষ। ভাঙন ঠেকাতে না পারলে কিছু দিনের মধ্যে আরও শতাধিক ঘরবাড়ি নদী গ্রাস করবে।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের ভাষ্য– জিও ব্যাগের মাধ্যমে যে কাজ হয় সেটি অস্থায়ী। সাময়িকভাবে ৬ নম্বর চরে ভাঙন ঠেকাতে এসব কাজ করছেন তারা। কিন্তু মানসম্মত কাজ হওয়ার পরও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না, কারণ ব্রহ্মপুত্র অত্যন্ত খরস্রোতা নদ।  তাছাড়া নদটির কোথাও খুব গভীর, কোথাও আবার কম। এসব বিচার বিশ্লেষণ করে ভাঙন ঠেকানোর জন্য বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে মিলে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী নদীতীর রক্ষা কাজ করার নকশা সম্পন্ন করেন তারা। এটি বাস্তবায়নে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিআইডব্লিউটিএর সময়সীমা শেষ হওয়ায় সেই কাজ করা সম্ভব হয়নি।

শেরপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী বলেন, এবার ভাঙন শুরু হওয়ার পর ওই এলাকায় গেছেন এবং পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। নদের তলদেশ থেকে ভাঙন শুরু হওয়ায় বালুর বস্তার নিচ দিয়ে পানি ঢুকছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাক্কলন তৈরি করা হচ্ছে। শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং কাজ শুরু করা হবে।

আরও পড়ুন

×