প্লেব্যাকের বাইরে অরিজিৎ
এই থামা কি হারিয়ে যাওয়া, নাকি নতুন রূপান্তর
অরিজিৎ সিং। ছবি: ফেসবুক
উপমা পারভীন
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:০২ | আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:০৬
গত দশ বছরে বলিউডের সিনেমার গানের দিকে তাকালে একটি কণ্ঠই বারে বারে ফিরে আসে। আর তা হলো অরিজিৎ সিং। প্রেমের উচ্ছ্বাস থেকে বিচ্ছেদের নিঃশব্দ বেদনা, অপরাধবোধ থেকে আত্মসমর্পণের প্রার্থনা। প্রায় প্রতিটি অনুভূতির জন্য যেন তাঁর কণ্ঠই হয়ে উঠেছিল স্বাভাবিক ঠিকানা। কিন্তু সেই বহুল পরিচিত সমীকরণ এবার বদলে যাচ্ছে। কারণ, প্লেব্যাক থেকে বিরতি নিলেন অরিজিৎ। ‘তুম হি হো’, ‘চান্না মেরেয়া’, ‘আগার তুম সাথ হো’, ‘কেরারিয়া’, এই গানগুলো কেবল টপচার্টের সাফল্য নয়, এক অনুভূতি। প্রেমে পড়া থেকে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার হাহাকার– সবকিছুর আবহসংগীত হয়ে উঠেছিল তাঁর গাওয়া গানগুলো।
২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ মুক্তির পর থেকেই বলিউডের প্রেমের গান মানেই যেন ছিল অরিজিৎ। তাঁর কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। পর্দায় চরিত্র যে-ই হোক। তাঁর গানের আবেগ যেন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে যেত। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু জনপ্রিয় গায়ক হয়ে ওঠেননি, তৈরি করেছিলেন এক ধরনের শ্রোতা। যারা গান শোনার আগে নাম দেখার প্রয়োজন মনে করতেন না কণ্ঠ শুনেই বোঝা যেত, এটা অরিজিৎ। তেমনটা আর হয়তো হবে না।
অরিজিৎ সিংয়ের বিদায়টাও তাঁর মতোই নিভৃত। নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণা, নেই বিদায়ী বক্তব্য। সাম্প্রতিক এক কথোপকথনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আর সিনেমার জন্য প্লেব্যাক গান গাওয়ার প্রতিযোগিতায় থাকতে চান না। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শিল্পীর ক্লান্তি, একই ধরনের আবেগ বারবার পরিবেশন করার চাপ এবং সর্বোপরি নিজের সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্ন।
অরিজিৎ নিজেই বলেছেন, ‘একসময় বুঝতে হয়, আপনি কেবল একটি ফর্মুলা হয়ে যাচ্ছেন। তখন থামাটাই সম্মানের।’ তাঁর এ কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন পরিণত শিল্পীর আত্মসমালোচনা। যেখানে সাফল্য ধরে রাখার দৌড় নয়; বরং নিজের শিল্পকে রক্ষা করার তাগিদই মুখ্য।
প্রশ্ন উঠছে– এই থামা কি হারিয়ে যাওয়া? নাকি এটি এক নতুন রূপান্তরের শুরু? অরিজিৎ নিজেই এর উত্তর দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি গান ছাড়ছেন না; ছাড়ছেন কেবল প্লেব্যাকের গণ্ডি। অর্থাৎ সিনেমার ফ্রেমে বাঁধা নয়; বরং নিজের শর্তে গান।
অরিজিতের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বলিউড সংগীতে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের শূন্যতা। কারণ অরিজিৎ শুধু গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন নির্মাতাদের নিরাপদ আশ্রয়। এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই জায়গা কে নেবে? আদৌ কি নেওয়া সম্ভব? হয়তো নতুন কণ্ঠ আসবে, নতুন ধারা তৈরি হবে।
অরিজিতের প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর অর্থ সম্ভবত নিজের দিকে ফিরে যাওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কণ্ঠশিল্পীর আগ্রহ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে, লাইভ কনসার্ট, অ্যালবাম, আধ্যাত্মিক গান এবং লোকসংগীতের দিকে। স্টুডিওর বাইরে গিয়ে তিনি খুঁজছেন নিজের শান্তি। আর এর কারণও আছে। অরিজিৎ বরাবরই আলো ঝলমলে তারকাজীবন থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। এই সিদ্ধান্তে আছে সেই একই মানসিকতা।
গানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এখানে সাফল্য ধরে রাখার তাড়না নেই, আছে সুরকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা। তাই বলা যায় অরিজিৎ সিংয়ের প্লেব্যাক অধ্যায়ের সমাপ্তি আসলে কোনো বিদায় নয়। হয়তো আগামী দিনে সিনেমার পর্দায় আর শোনা যাবে না তাঁর কণ্ঠ। কিন্তু হেডফোনে, একাকী রাতে, কিংবা হঠাৎ পুরোনো প্লে লিস্টে– অরিজিৎ সিং থাকবেন। কারণ কিছু কণ্ঠ বিদায় নেয় না; তারা সময়ের সঙ্গে মিশে থাকেন।
- বিষয় :
- অরিজিৎ সিং
- সংগীত
- সংগীতশিল্পী
- প্লেব্যাক
