ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ঢাকা থেকে ভার্জিনিয়া: মঞ্চপোশাকের সুতোয় গাঁথা সাকীর স্বপ্ন

ঢাকা থেকে ভার্জিনিয়া: মঞ্চপোশাকের সুতোয় গাঁথা সাকীর স্বপ্ন
×

‘নিলয় না জানি ’নাটকের দৃশ্য। ইনসেটে এনামতারা সাকী। ছবি:সংগৃহীত

এমদাদুল হক মিল্টন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৫:০৬ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৫:১৫

মঞ্চনাটকের দর্শক যখন কোনো চরিত্রকে প্রথম দেখেন, তখন সংলাপ শোনার আগেই চোখে পড়ে তার পোশাক। সেই পোশাকই বলে দেয় চরিত্রটির সময়, সমাজ, মানসিকতা, অবস্থান ও গল্পের ভেতরে তার ভূমিকা। তাই মঞ্চপোশাক কেবল পরিধেয় নয়; এটি নাট্যভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর সেই শিল্পভাষাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশের মঞ্চপোশাক-পরিকল্পনাকারী এনামতারা সাকী।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ধ্রুপদ.অর্গ-এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক ‘নিলয় ন জানি’। সম্প্রতি ব্যালেট নোভা সেন্টার ফর ড্যান্স, ফলস চার্চ, ভার্জিনিয়ায় অনুষ্ঠিত দুই দিনের প্রদর্শনী দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। নাটকটির রচয়িতা ড. শাহমান মৈশান এবং নির্দেশনায় ছিলেন তাসকিন বিনতে সিদ্দিক। এই প্রযোজনার মঞ্চপোশাক পরিকল্পনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশে অবস্থানরত  সাকী।

একটি আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় কাজ করা সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। কিন্তু এই প্রযোজনার বিশেষত্ব ছিল—পরিকল্পনাকারী এবং নাট্যদল ছিলেন দুই ভিন্ন মহাদেশে। হাজারো কিলোমিটারের দূরত্ব তাদের কাজকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। প্রযুক্তিই হয়ে উঠেছিল তাদের মহড়াকক্ষ।


ভিডিও আলাপ, অনলাইন মহড়ার ভিডিও, ফোনালাপ এবং অসংখ্য ভার্চুয়াল আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে পুরো কাজ। চরিত্র বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে রঙ নির্বাচন, কাপড়ের ধরন, পোশাকের ছাঁট, অলংকারের ব্যবহার—সবকিছু নিয়েই চলেছে দীর্ঘ পরিকল্পনা। সময়ের ব্যবধানের কারণে বাংলাদেশের গভীর রাত পর্যন্ত চলত সেই আলোচনা। কখনো রাত দুইটা, কখনো তিনটা—সৃজনশীল কাজের সেই নির্ঘুম রাতগুলোই শেষ পর্যন্ত সফলতার ভিত্তি তৈরি করেছে।

এনামতারা সাকী বলেন, ‘নাটকের মঞ্চপোশাক শুধু পোশাক নয়, এটি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব প্রকাশের একটি শিল্পভাষা। বাংলাদেশে বসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নাটকের জন্য কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় এবং দলের মধ্যে বিশ্বাস থাকে, তাহলে ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো বাধা নয়।’
নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর শুরু হয় আরেকটি কঠিন অধ্যায়। বাংলাদেশে পোশাক তৈরি, প্রতিটি মঞ্চপোশাকের মান যাচাই, যত্নসহকারে মোড়কজাত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো;প্রতিটি ধাপেই ছিল উদ্বেগ। পোশাক সময়মতো পৌঁছাবে কি না, কোনো ক্ষতি হবে কি না—এসব প্রশ্ন ছিল সব সময়। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে মঞ্চপোশাকগুলো নিরাপদে পৌঁছে যায় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের হাতে। এরপর সেই পোশাকেই মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে নাটকের প্রতিটি চরিত্র।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অনন্য সমন্বয়ও। নাট্যকার ড. শাহমান মৈশান, নির্দেশক তাসকিন বিনতে সিদ্দিক সুমী এবং মঞ্চপোশাক-পরিকল্পনাকারী এনামতারা সাকী—তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থী। একই বিভাগে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাদের শিল্পভাবনা ও কাজের ভাষাকে একসূত্রে বেঁধেছে। ফলে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
এনামতারা সাকী বলেন, ‘মঞ্চে অভিনেতাদের শরীরে যখন আমার পরিকল্পনা করা পোশাক দেখলাম, তখন মনে হয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সফল হয়েছে। এই অর্জন ব্যক্তিগত নয়; এটি পুরো দলের সম্মিলিত শ্রম, আস্থা এবং ভালোবাসার ফসল।’

এনামতারা সাকীর আন্তর্জাতিক পথচলা অবশ্য নতুন নয়। বাংলাদেশে থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ও নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং ফিলিপাইনের বিশ্ব মঞ্চপোশাক উৎসব-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রযোজনার মঞ্চপোশাক পরিকল্পনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (বিসিটিআই), প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও কর্মশালা পরিচালনাকারী হিসেবে কাজ করছেন।

তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র বাংলাদেশের লোকজ পোশাক, নাট্যপোশাক, ঐতিহ্যবাহী অলংকার, দৃশ্যসংস্কৃতি এবং পারফরম্যান্স স্টাডিজ। নতুন প্রজন্মের মঞ্চপোশাক পরিকল্পনাকারী তৈরির পাশাপাশি তিনি বর্তমানে চলচ্চিত্র ও আন্তর্জাতিক নাট্যপ্রযোজনার মঞ্চপোশাক পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এ ডিজাইনার।

ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশ কস্টিউম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করতে চান  সাকী। যেখানে বাংলাদেশের লোকজ পোশাক, নাট্যপোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী অলংকার নিয়ে গবেষণা, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক উপস্থাপনার একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠবে।

ভার্জিনিয়ার মঞ্চে ‘নিলয় ন জানি’ নাটকের মঞ্চপোশাক শুধু একটি প্রযোজনার অংশ নয়; এটি বাংলাদেশের সৃজনশীলতারও এক উজ্জ্বল পরিচয়। সাকীর এই অর্জন দেখিয়ে দিল, প্রতিভা, পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে ঢাকা থেকে বসেই বিশ্বমঞ্চে শিল্পের নতুন কাজ করা সম্ভব। 
 

আরও পড়ুন

×