সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের সফল পপতারকা হিসেবে
আরিয়ানা গ্রান্ডে
মীর সামী
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৪:০৮ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৪:২২
পপসংগীতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের গান, প্রতিটি মঞ্চে উপস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের ছোট্ট ঘটনাও মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে। সেই তালিকার অন্যতম একজন আরিয়ানা গ্রান্ডে। কিশোরী বয়সে টেলিভিশনে অভিনয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন আরিয়ানা। সময়ের সঙ্গে নিজেকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের অন্যতম সফল পপতারকা হিসেবে। প্রকাশ হওয়া প্রতিটি অ্যালবাম তাঁর ক্যারিয়ারে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
২০২৬ সালে এসেও তিনি প্রমাণ করছেন, পপসংগীতের শীর্ষ আসনে তাঁর অবস্থান এখনও অটুট। একদিকে বহুল প্রতীক্ষিত অষ্টম স্টুডিও অ্যালবাম ‘পেটাল’; অন্যদিকে সাত বছর পর শুরু হওয়া ‘ইটারনাল সানশাইন ট্যুর’। সব মিলিয়ে চলতি বছর যেন সম্পূর্ণ আরিয়ানারই দখলে। আরিয়ানার সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি কখনও এক স্থানে স্থির থাকেননি। প্রতিটি অ্যালবামে নিজেকে নতুনরূপে আবিষ্কার করেছেন।
প্রথম অ্যালবাম ‘ইওরস ট্রুলি’তে ছিলেন আর-অ্যান্ড-বি-ঘরানার সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী। এরপর আরিয়ানা প্রকাশ করেন ‘মাই এভরিথিং’। এই অ্যালবাম তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। তারপর ‘ডেঞ্জারাস ওম্যান’ অ্যালবামে পাওয়া যায় আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী এক আরিয়ানাকে। ‘সুইটনার’ ও ‘থ্যাঙ্ক ইউ, নেক্সট’–এ দুটি অ্যালবাম কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যই আনেনি, সমালোচকদের কাছেও আরিয়ানাকে প্রতিষ্ঠিত করে অনন্য শিল্পী হিসেবে। তারপর ‘পজিশনস’ অ্যালবামে তিনি প্রেমের নতুন ভাষা খুঁজেছেন আর ‘ইটারনাল সানশাইন’ অ্যালবামে স্থান পেয়েছে বিচ্ছেদ, আত্মসমালোচনা ও মানসিক পুনর্জন্মের গল্প। সেই ধারাবাহিকতারই নতুন সংযোজন অষ্টম স্টুডিও অ্যালবাম ‘পেটাল’। ৩১ জুলাই প্রকাশ হবে অ্যালবামটি। ‘পেটাল’ নাম শুনে প্রেমের গল্পের আভাস মিললেও, অ্যালবামের গানগুলো অনেক বেশি জটিল। অ্যালবামটির সহ-লেখক ও নির্বাহী প্রযোজকও আরিয়ানা নিজেই। সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, ‘পেটাল’ অ্যালবামে মূলধারার পপের সঙ্গে অল্টারনেটিভ পপ, ডার্ক সিন্থ, সিনেম্যাটিক অর্কেস্ট্রেশন এবং মিনিমাল ভোকাল অ্যারেঞ্জমেন্টের মেলবন্ধন করেছেন আরিয়ানা। ফলে এটি শুধু বাণিজ্যিক দিক থেকে নয়, শিল্পমানের বিচারেও তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে।
কিছুদিন আগেই প্রকাশ হয়েছে অ্যালবামের প্রথম সিঙ্গেল ‘হেইট দ্যাট আই মেইড ইউ লাভ মি’। গানটি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গানটির মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছেন ক্রিশ্চিয়ান ব্রেসলাওয়ার। ভিডিওজুড়ে রয়েছে হরর সিনেমার আবহ, রহস্যময় আলোর ব্যবহার, প্রতীকী দৃশ্য ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প বলার কৌশল। এতে আরিয়ানার বিপরীতে অভিনয় করেছেন হলিউড অভিনেতা জাস্টিন লং। প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই গানটি বিলবোর্ড টপ ১০০-এর শীর্ষে উঠে আসে। বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে কোটিরও বেশিবার শোনা হয়েছে। বর্তমানে বিলবোর্ডের টপচার্টের সেরা ৪-এ রয়েছে গানটি।
এদিকে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের আগে ইনস্টাগ্রামে কয়েকটি অ্যাকাপেলা টিজার প্রকাশ করেছেন আরিয়ানা। টিজারগুলোয় নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। শুধুই তাঁর কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠেই ফুটে উঠেছে নতুন অ্যালবামের গভীরতা। সমালোচকদের মতে, এ টিজারগুলোয় আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি খোলামেলা ও ব্যক্তিগত মনে হয়েছে আরিয়ানাকে। মনে হয়েছে, তিনি এবার নিখুঁত একজন পপতারকা হওয়ার চেয়ে মানুষ হিসেবেই নিজের গল্প বলতে চাইছেন। ভক্তদের মতে, অনেক দিন পর আবারও কেবল কণ্ঠের শক্তিতে সবাইকে মুগ্ধ করেছেন তিনি।
২০১৯ সালের ‘সুইটনার ওয়ার্ল্ড ট্যুর’-এর পর গত জুনে আরিয়ানা শুরু করেছেন ‘ইটারনাল সানশাইন ট্যুর’; যা ইতোমধ্যে বছরের অন্যতম আলোচিত কনসার্ট সফরে পরিণত হয়েছে। প্রায় সাত বছর পর বড় আকারের বিশ্ব সফরে ফিরে তিনি দেখিয়েছেন, কেন তিনি সমসাময়িক পপসংগীতের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একজন। মঞ্চে ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির শহরের আদলে সেট নির্মাণ। এলইডি ভিজ্যুয়াল, নাটকীয় আলো, সিনেমার মতো দৃশ্যান্তর ও নিখুঁত কোরিওগ্রাফি–সব মিলিয়ে এটি শুধু কনসার্ট নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা। প্রতিটি গানকে ভিন্ন গল্পে রূপ দিয়েছেন তিনি। কোথাও প্রেমের কোমলতা, কোথাও মহাকাশ, কোথাও স্বপ্ন, কোথাও স্মৃতির করিডোর, আবার কোথাও একাকিত্বের অন্ধকার। পুরো কনসার্ট যেন আবেগ, স্মৃতি ও সংগীতের এক অনন্য ভ্রমণ।
আরিয়ানার সোলানি চুল ছিল একসময় বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। কিন্তু নতুন সফরে সেই পরিচিত লুক বদলে তিনি হাজির হয়েছেন হানি-ব্রাউন ব্যালেরিনা স্টাইলে। নরম রঙের নান্দনিকতা তাঁকে দিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়। মজার বিষয় হলো, তাঁর টিমও এবার কনসার্টের গল্প বলার অংশ হয়ে উঠেছে। পোশাক, চুল, মেকআপ–সবকিছুই সাজানো হয়েছে প্রতিটি গানের আবেগের সঙ্গে মিল রেখে।
আরিয়ানার ব্যক্তিজীবনও ভক্তদের আগ্রহের। সাম্প্রতিক কয়েকটি কনসার্টে তিনি ‘থ্যাঙ্ক ইউ, নেক্সট’ গানের কিছু লিরিক বদলে গাওয়ার পর শুরু হয় নতুন জল্পনা। অনেকেই বলছেন, গানের কথায় কি ফিরে এলো পুরোনো প্রেম? আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, তাঁর সাবেক প্রেমিক রিকি আলভারেজের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও জোড়া লেগেছে। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে, এমনকি ব্রুকলিনের একটি কনসার্টেও রিকিকে আরিয়ানার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে দেখা যায়। তবে প্রেম নিয়ে বরাবরের মতোই নীরব আরিয়ানা।
মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ে আরিয়ানা নিজেকে শুধু একজন রক গায়িকা নয়, বরং বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত করেছেন। তাঁর কণ্ঠ, নতুন ধারার সাউন্ড এবং নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আজকের আরিয়ানা শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি একটি ব্র্যান্ডের নামও। সংগীতের পাশাপাশি তাঁর সুগন্ধি, প্রসাধনী, ফ্যাশন এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব বিশ্বজুড়ে। জীবনের কঠিন সময়গুলোকে তিনি বারবার গানে রূপ দিয়েছেন, তাই তাঁর গান অনেকের কাছে শুধু বিনোদন নয়, মানসিক আশ্রয়ও।
‘পেটাল’ মুক্তির পর বিশ্ব সফরের আরও কয়েকটি শহরে পারফর্ম করবেন আরিয়ানা। সংগীত বিশ্লেষকদের ধারণা, অ্যালবামটির একাধিক গান খুব দ্রুতই বৈশ্বিক চার্টে শীর্ষস্থান দখল করবে। তাদের মতে, ‘পেটাল’ শুধু আরেকটি সফল অ্যালবাম নয়; এটি আরিয়ানার শিল্পীজীবনের নতুন সংজ্ঞা হতে পারে।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁকে অনেকে শুধু অসাধারণ কণ্ঠের একজন পপতারকা হিসেবেই দেখেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আরিয়ানা নিজেকে প্রমাণ করেছেন দক্ষ গীতিকার, সংগীত নির্মাতা, অভিনেত্রী ও মঞ্চশিল্পী হিসেবে। আজ আরিয়ানা গ্রান্ডে শুধু শীর্ষে থাকা একটি নাম নন; তিনি সমসাময়িক পপসংগীতের বিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘পেটাল’। এই অ্যালবাম আবারও প্রমাণ করবে, কেন সমসাময়িক পপসংগীতের আকাশে তিনি সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। হয়তো নতুন এ অ্যালবামের প্রতিটি গানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে তাঁর জীবনের নতুন গল্প। সেই গল্প শুনতেই অপেক্ষায় বিশ্বের সংগীতপ্রেমীরা।
- বিষয় :
- আরিয়ানা গ্রান্ডে