দিল্লিতে রাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর ফের লাঠিচার্জ-টিয়ার শেল
দাবি আদায়ে স্লোগান দেন সিজেপির সমর্থকরা। বৃহস্পতিবার দিল্লির যন্তর-মন্তরে। ছবি: এএফপি
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৫:০৫ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪৬
আরও একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল দিল্লি। বুধবার রাতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়ে পুলিশ। অন্যদিকে, পুলিশকে লক্ষ্য করেও পাথর ছোঁড়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার সন্ধ্যা থেকেই দিল্লির যন্তর-মন্তরের চারপাশে বিক্ষোভকারীদের ভিড় ক্রমে বাড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে ভিড় টলস্টয় মার্গ এবং পার্লামেন্ট স্ট্রিট পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে লেখা হয়েছে, মূল জমায়েতের এলাকা দুইদিক থেকে লোহার বেড়া দিয়ে কিছুটা ছোটো করে দিয়েছিল পুলিশ। তাই বহু বিক্ষোভকারী মূল মঞ্চের দিকে যেতে না পেরে নানা জায়গায় ছোটো ছোটো জমায়েত করেন।
এই জমায়েতগুলো ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সন্ধ্যায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এসময় পাল্টা আক্রমণ করা হয় এবং তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালেও যন্তর-মন্তরে বহু বিক্ষোভকারী হাজির হয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ এবং দাঙ্গাদমন বাহিনী ‘র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স’-এর সদস্যরাও হাজির হয়েছেন। বুধবারের মতো বৃহস্পতিবারও দিল্লি মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।

মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার বিষয়ে সিজেপি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, ‘মেট্রো স্টেশন বন্ধ করার এই প্রতিদিনের নাটক কেন? আপনারা যাই করুন না কেন, মানুষ যন্তর-মন্তরে আসতেই থাকবে।’
বৃহস্পতিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে। এর মাঝে বৃহস্পতিবার ভোরে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের যুবসমাজের প্রশংসা করে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার বিচার ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতে করার আশ্বাস দেন।
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ নিয়ে বুধবার সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন শুনতে রাজি হননি প্রধান বিচারপতি। জরুরি আরজির আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এই আন্দোলন বিরোধীদের মদতপুষ্ট বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
‘লাঠিচার্জের ঘটনা খুবই নৃশংস’
প্রথম থেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে নৃশংসতা এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। বুধবার রাতের ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন অভিজিৎ দীপকে। সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘লাঠিচার্জের ঘটনাটা খুবই নৃশংস ছিল এবং যে পুলিশ কর্মকর্তারা লাঠি চালিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে যাব।’

দীপকে বলেন, ‘আজ আমাদের প্রতিবাদের ৩৪তম দিন। সোনম স্যারের (সোনম ওয়াংচুক) অনশন চলছে। আজ তাঁর অনশনের ২৬তম দিন। তাই আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। কিন্তু আমরা সোনম স্যারকে তার অনশন শেষ করার অনুরোধ করছি, কারণ আমরা তাঁকে হারাতে চাই না।’
সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস হবে না। তিনিও বিক্ষোভকারীদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগে যেসব আন্দোলন হয়েছে সেখানে শাসকদল সমাজবিরোধীদের অনুপ্রবেশ করিয়েছিল। এরপর আন্দোলনের ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল। এবার এমনটা যেন না হয়।
বুধবার সাংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা অভিযোগ করেন, বিরোধী দলগুলো আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে। সে প্রসঙ্গে সৌরভ দাস বলেন, ‘জেপি নাড্ডার লজ্জা হওয়া উচিত। মানুষ এখানে ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বসে আছে এবং বলছে যে কোনো রাজনীতি চলবে না। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে কোনো আপস হবে না; তাঁকে যেতেই হবে। ততদিন পর্যন্ত এই প্রতিবাদ চলবে।’

সৌরভ বলেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হোক। এই গভীর আলোচনার জন্য সংসদই সঠিক জায়গা। আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, কারণ শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এটা সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব।’
এদিকে অনশনের ২৫তম দিনে হাসপাতাল থেকে ভিডিও বার্তা দেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘আমি সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের স্যালুট জানাতে চাই, যারা প্রশংসনীয় সংযম প্রদর্শন করেছে। লাঠিচার্জের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো পাল্টা আক্রমণ করেনি। তাদের ওপর এই নৃশংস ঘটনা দেখে আমি আমার অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
পুলিশ কী বলছে?
বুধবার রাতের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল ছোঁড়ার ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ। এসিপি (পাঞ্জাবী বাগ) জয় প্রকাশ বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, ‘আমি যন্তর-মন্তরের কাছে ধর্নাস্থলে সকাল সাতটা থেকে ছিলাম। আন্দোলনকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং ডিস্টার্বেন্স তৈরি করছিলেন।’
জয় প্রকাশ বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে যেতে থাকলে আমরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা মানবশৃঙ্খল এবং ব্যারিকেড তৈরি করি। কিন্তু হঠাৎ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও বোতল ছুঁড়তে থাকেন বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তারই একটা পাথর এসে আমার মাথায় লাগে।’