সংগ্রামে ভরা ছিল জীবন, ৪৫০ ছবির নায়িকার মৃত্যু ঘিরে রহস্য কাটেনি আজও
সিল্ক স্মিথা
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০১ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০৫
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র সিল্ক স্মিথা। রূপালি পর্দায় তার উপস্থিতি ছিল দর্শক টানার অন্যতম বড় আকর্ষণ। তবে তুমুল জনপ্রিয়তার আড়ালে তার ব্যক্তিজীবন ছিল সংগ্রাম, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ভরা। বিশেষ করে মৃত্যুর আগের রাতে করা কয়েকটি ফোনকল আজও রহস্য হয়ে আছে।
১৯৯৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাতে অভিনেত্রী অনুরাধাকে ফোন করেছিলেন সিল্ক স্মিথা। তাকে নিজের কাছে আসতে বলেছিলেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলার ছিল বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন অনুরাধার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরদিন দেখা করার কথা ছিল দুজনের।
একই রাতে অভিনেতা রবিচন্দ্রনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন সিল্ক। তখন শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন রবিচন্দ্রন। ফোনে কথা বলার চেষ্টা হলেও দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
পরদিন সকালে দুজনের কাছেই পৌঁছায় ভয়ংকর খবর—চেন্নাইয়ের বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে সিল্ক স্মিথাকে। বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর।

মৃত্যুর আগের রাতের সেই ফোনকলগুলোতে সিল্ক কী বলতে চেয়েছিলেন, তা আর কখনো জানা যায়নি। তাঁর পরিচিতদের মনে রয়ে গেছে সেই প্রশ্ন।
যেভাবে ‘সিল্ক’ হয়ে উঠলেন
সিল্ক স্মিথার আসল নাম ভাদলাপতি বিজয়লক্ষ্মী। ১৯৬০ সালের ২ ডিসেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের কোভালি গ্রামে জন্ম তাঁর। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা বিজয়লক্ষ্মীর পড়াশোনা চতুর্থ শ্রেণিতেই থেমে যায়।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বয়সে বড় এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই সেই সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বিজয়লক্ষ্মী।
পরে মায়ের সঙ্গে চেন্নাইয়ে চলে যান তিনি। সেখানে একজন অভিনেত্রীর মেকআপ বা টাচ-আপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই কাজ করতে করতেই অভিনয়ের সুযোগ আসে।

মালয়ালম পরিচালক অ্যান্টনি ইস্টম্যান তাঁকে ‘ইনায়ে থেডি’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সুযোগ দেন। তখনই তাঁর নাম রাখা হয় স্মিথা। পরে পরিচালক ভিনু চক্রবর্তী তাঁর ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। ইংরেজি ভাষা ও নাচ শেখাতেও তাঁকে সাহায্য করেন তিনি।
এরপর ১৯৭৯ সালের ‘ভান্দিচক্রম’ সিনেমায় ‘সিল্ক’ নামের একটি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সিনেমাটি সফল হওয়ার পর সেই নামই তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। বিজয়লক্ষ্মী হয়ে ওঠেন সিল্ক স্মিথা।
৪৫০টির বেশি সিনেমায় অভিনয়
প্রায় ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, কন্নড় ও হিন্দি ভাষার ৪৫০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেন সিল্ক স্মিথা। বিশেষ করে তাঁর নাচের দৃশ্যগুলো দর্শকদের মধ্যে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিল।
তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে অনেক প্রযোজক সিনেমায় তাঁকে যুক্ত করতেন। তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাঁর জন্য তৈরি হয় নির্দিষ্ট একটি পর্দা-ইমেজ। ক্যাবারে নৃত্যশিল্পী, ভ্যাম্প কিংবা আবেদনময়ী নারী—বেশির ভাগ সময় এমন চরিত্রেই দেখা যেত তাঁকে। ফলে অভিনয়ক্ষমতার অন্য দিকগুলো প্রকাশের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পেয়েছেন তিনি।
বালু মহেন্দ্রর ‘মুন্দ্রম পিরাই’ এবং এর হিন্দি রিমেক ‘সদমা’য় তাঁর ভিন্ন সম্ভাবনার কিছুটা দেখা যায়। দুই সিনেমাতেই অভিনয় করেছিলেন শ্রীদেবী ও কমল হাসান। হিন্দি সংস্করণেও নিজের চরিত্রে অভিনয় করেন সিল্ক।

মৃত্যুর আগে লেখা চিঠি নিয়েও প্রশ্ন
সিল্ক স্মিথার বাড়ি থেকে একটি চিঠি উদ্ধারের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে চিঠিটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, চিঠির কিছু অংশ স্পষ্টভাবে পড়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন অনুবাদও প্রকাশিত হয়।
কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চিঠিতে অভিনয়জীবনে কঠোর পরিশ্রম, মানুষের সুযোগ নেওয়া, একাকিত্ব, ভেঙে যাওয়া প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কথা লিখেছিলেন সিল্ক। ‘বাবু’ নামে ডা. রাধাকৃষ্ণনের কথাও সেখানে ছিল বলে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য মূলত ওই কথিত চিঠির প্রতিবেদিত বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল; স্বাধীনভাবে সব তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
সিল্ক স্মিথার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এমনকি তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে—এমন জল্পনাও তৈরি হয়েছিল। তবে হত্যার পক্ষে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মৃত্যুর পরও তাকে ঘিরে সিনেমা
সিল্ক স্মিথার জীবন ও পর্দার ইমেজ বহু বছর পরও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকর্ষণ করেছে। ২০১১ সালে বিদ্যা বালান অভিনীত ‘দ্য ডার্টি পিকচার’ মুক্তির পর সিনেমাটিকে সিল্ক স্মিথার জীবনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে প্রযোজক একতা কাপুর জানিয়েছিলেন, সিনেমাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিল্কের জীবন অবলম্বনে তৈরি নয়। তাঁর পরিবারও সিনেমাটির উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।
পরে কন্নড় ভাষায় ‘ডার্টি পিকচার: সিল্ক সাক্কাথ হট’ এবং মালয়ালমে ‘ক্লাইম্যাক্স’-এর মতো সিনেমাতেও তাঁর জীবন ও পর্দার ইমেজ উঠে আসে।
তবে সিল্ক স্মিথাকে ঘিরে আলোচনায় বারবার সামনে আসে তাঁর আবেদনময়ী পর্দা-ইমেজ ও অকালমৃত্যু। আড়ালে থেকে যায় সেই মেয়েটির গল্প—যার পড়াশোনা চতুর্থ শ্রেণিতেই থেমে গিয়েছিল, মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল এবং নির্যাতনের সংসার ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে হয়েছিল।
মৃত্যুর আগের রাতে পরিচিত মানুষদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন সিল্ক। কী বলতে চেয়েছিলেন, তা আর কখনো জানা যায়নি। সেই অসমাপ্ত কথাই তাঁর জীবনের অন্যতম অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে। সূত্র: এনডিটিভি