টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মন ছুঁয়েছে বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’
টরন্টোতে প্রিমিয়ার শেষে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এর কলাকুশলীরা
অনিন্দ্য মামুন, টরন্টো (কানাডা) থেকে
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৫ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৭
টরন্টোর কিং স্ট্রিট। ব্যস্ত শহরের এই পথেই দাঁড়িয়ে টিআইএফএফ লাইটবক্স—বিশ্বের নানা প্রান্তের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনমেলা। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিআইএফএফ) মূল কেন্দ্র এই ভবনে প্রতিদিনই বসছে সিনেমাপ্রেমীদের ভিড়। পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহের একটিতে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় আলো নিভল। পর্দায় ভেসে উঠল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। প্রদর্শনী শেষে আলো জ্বলার পরও যেন পর্দার গল্প থেকে বের হতে পারছিলেন না অনেক দর্শক। কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে প্রশংসা। কেউ বললেন নারীর মুক্তির কথা, কেউ ভাবলেন সৌন্দর্যের নামে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি টিআইএফএফের ৫১তম আসরের সেন্টারপিস বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। উৎসবে প্রদর্শিত প্রায় ৩০০ চলচ্চিত্রের ভিড়ে বাংলাদেশের এই ছবিটি দেখতে বিভিন্ন দেশের দর্শকের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় রাত ১০টায় টিআইএফএফ লাইটবক্সে হয়েছে সিনেমাটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মশিয়ন ব্যাং প্রেক্ষাগৃহে হওয়ার কথা রয়েছে আরও একটি প্রদর্শনী।
ভয়ের গল্পে মুক্তির কথা
কানাডায় বেড়াতে এসে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতা নিতে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখতে এসেছিলেন আমেরিকান তরুণ জন। সিনেমা দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এটি একই সঙ্গে ভৌতিক ও গভীরভাবে চিন্তার খোরাক জোগানো একটি চলচ্চিত্র।
জন বলেন, ‘সত্যি বলতে, ভুতুড়ে কনের দৃশ্যগুলো নিয়ে এখনও ভাবছি। সাধারণত ভৌতিক চলচ্চিত্রে ভূত বা কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তাকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এখানে ভূতকে মানুষের ভেতরের ভয়, দ্বন্দ্ব কিংবা মানসিক অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হররের মাধ্যমে গল্প বলার এটি আমার কাছে খুবই চমৎকার ও আকর্ষণীয় একটি পদ্ধতি মনে হয়েছে।’
তবে সিনেমার ভৌতিক আবহের চেয়েও যে বিষয়টি তাঁকে বেশি নাড়া দিয়েছে, সেটি নিজের মনের কথা শোনা। জনের ভাষায়, ‘জীবনে কখনো কখনো নিজের অন্তর্দৃষ্টি বা মনের কথা অনুসরণ করা জরুরি। এমনকি সংস্কৃতি কিংবা পরিবারের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে ভিন্ন কিছু করতে হলেও। কারণ নিজের মনের কথা না শুনলে কিংবা নিজের ওপর আস্থা না রাখলে কী পরিণতি হতে পারে, এ সিনেমা যেন সেটিও দেখিয়েছে। আশা করি, সিনেমাটি আরও অনেক দূর যাবে এবং সাফল্য পাবে।’
কানাডীয় তরুণী জের কাছে সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাঁর চোখে গল্পের উচ্চবিত্ত তরুণীটি যেন ছিল ‘সোনার খাঁচায় বন্দি’।
তিনি বলেন, ‘গল্পের মেয়েটির মুক্তি দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সে যেন একটি সোনার খাঁচায় বন্দি ছিল। সিনেমাটিকে ব্যাখ্যা করতে হলে এটাই বলব। আর শেষ দৃশ্যটি বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয়েছে। মেয়েটি যখন চুল কেটে ফেলে, এরপর এমন একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটে, যেটি দেখতে অনেকটা সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের এলাকার মতো। তখন মনে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সে নিজের বন্দিদশা থেকে সত্যিই মুক্ত হতে পেরেছে।’
মায়া নামের এক বয়স্ক কানাডীয় নারীও সিনেমাটিকে দেখেছেন নারীর অবস্থান ও আধুনিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার কাছে সিনেমাটি ভীষণ শক্তিশালী মনে হয়েছে। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটা সত্যিই ভালো লেগেছে। বিষয়টি আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে।’
কানাডীয় দর্শক সুজান স্মিথের চোখে সিনেমাটি একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও ‘চোখ খুলে দেওয়ার মতো’। তিনি বলেন, ‘নির্মাতা বাংলাদেশের শ্রেণিবৈষম্য নিয়েও কথা বলেছেন, যা বেশ তথ্যবহুল ছিল। বিশেষ করে সৌন্দর্য সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুন্দর হতে গিয়ে নারীরা কী কী করেন—এসব বিষয় যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা বেশ আকর্ষণীয়। একই সঙ্গে মনে হয়েছে, নির্মাতা হয়তো বিষয়টিকে কিছুটা ব্যঙ্গও করেছেন।’
কানাডাপ্রবাসী নির্মাতা ও টরন্টো ফিল্ম স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদির কাছে সিনেমাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিজের শরীর ও চেহারাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা।
তিনি বলেন, ‘সিনেমাটি নারীবাদ নিয়ে কথা বলেছে। নিজের শরীর ও চেহারা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার কথাও বলে। আমার মনে হয়, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কনে কিংবা বর—যার চেহারা যেমন, তা নিয়েই স্বচ্ছন্দ থাকা উচিত। গায়ের রং, শরীরের দাগ—এসব শরীরেরই নিজস্ব অংশ। এগুলো মেনে নিয়ে নিজের মতো করে আনন্দে থাকা উচিত।’
সাত বছর পর টরন্টোয় রুবাইয়াত
টরন্টোর এই শহরেই সাত বছর আগে এসেছিলেন রুবাইয়াত হোসেন। ২০১৯ সালে ৪৪তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড সিনেমা বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। সাত বছর পর একই উৎসবে আবারও ফিরেছেন তিনি, এবার ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে।
এর আগে ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে প্রদর্শিত হয়ে আলোচনায় আসে চলচ্চিত্রটি। ভেনিস থেকে টরন্টো এসে নিজের সিনেমার প্রদর্শনী দেখে রুবাইয়াত হোসেনের চোখেমুখেও ছিল তৃপ্তির ছাপ।
তিনি বলেন, ‘টরন্টোতে আমাদের সিনেমার তিনটি শো। সব কটির টিকিট সোল্ড আউট। আজ প্রেক্ষাগৃহভর্তি দর্শক ছিল। প্রদর্শনী শেষে ২০ থেকে ২৫ মিনিট প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়েছে। অনেক বাংলাদেশি দর্শকও দেখলাম।’
টিআইএফএফের দর্শকদের নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘এখানে শত শত চলচ্চিত্র দেখানো হয়। এটা অনেকটা কনফারেন্স বা কনভেনশনের মতো। এ উৎসবের দর্শক দারুণ। তারা সারা বছর এই উৎসবের জন্য অপেক্ষা করেন। সাধারণ তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা—সব বয়সের মানুষ সিনেমা দেখেন।’
শামুক-কেঁচো কেন?
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ টিকটিকি, সাপ, কেঁচো ও শামুকের মতো প্রাণীর উপস্থিতি অনেক দর্শকেরই কৌতূহল তৈরি করেছে। এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা ব্যাখ্যা করলেন, এগুলো কোনো সরল প্রতীক নয়; বরং দর্শকের শরীর ও মনে একটি অনুভূতি তৈরি করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
রুবাইয়াত বলেন, ‘আমার চাওয়া ছিল, এই ফিল্ম দেখার পর দর্শক যেন নিজের শরীরে কিছু একটা অনুভব করেন। ক্লোজআপে শামুক, কেঁচো বা টিকটিকি দেখলে সবার ভেতরে একটা স্পন্দন ঘটে। এটা লজিক্যাল কিছু নয়। আবার কোনো প্রতীক হিসেবেও এগুলো দেখাইনি। এটি শুধুই এক ধরনের অনুভূতি।’
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলো ঘুরে সিনেমাটিকে বিশ্বের আরও দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন তাঁর প্রত্যাশা। নির্মাতা বলেন, ‘যেকোনো ফিল্মমেকারের স্বপ্ন থাকে তাঁর সিনেমা প্রচুর দর্শক দেখবেন। আমারও প্রত্যাশা, “দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড” যাতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবেশন করতে পারি। ভেনিস ও টরন্টোর পর ধাপে ধাপে আমরা বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসব এবং শিকাগোতে যাচ্ছি।’
চাটগাঁইয়া তরুণের গান
সিনেমার গল্প যেমন বাংলাদেশের, তেমনি এর সংগীতেও রয়েছে প্রবাসী এক বাংলাদেশি তরুণের স্পর্শ। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর সংগীত পরিচালনা করেছেন কানাডাপ্রবাসী দামীর খান। তাঁর দাদাবাড়ি চট্টগ্রামে, নানাবাড়ি বরিশালে; বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। এবারই প্রথম নিজের দেশের কোনো চলচ্চিত্রে কাজ করলেন তিনি।
সিনেমায় তাঁর সুর করা ও গাওয়া দুটি গান—‘ঢাকা লাভ’ ও ‘বিলিভ’। টরন্টোতে উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ারের পর দামীরের কণ্ঠে ছিল গর্ব ও আনন্দ। তিনি বলেন, ‘এত বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’
সৌন্দর্যের আড়ালে নিয়ন্ত্রণ
সমকালীন ঢাকার একটি বিউটি সেলুনকে ঘিরে এগিয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প। বিয়ের আগে একজন নারীর শরীরকে ‘সুন্দর’ করে তোলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিনেমাটি প্রশ্ন তুলেছে সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণা, আকাঙ্ক্ষা, নারীর শরীরের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে।
বাস্তবতার সঙ্গে হরর, অতিপ্রাকৃত উপাদান ও দক্ষিণ এশীয় লোকবিশ্বাসের মিশেলে তৈরি হয়েছে সিনেমাটির নিজস্ব আবহ। বিয়েকে ঘিরে সৌন্দর্যচর্চার যে সামাজিক আয়োজন, সেটিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভয়ের অভিজ্ঞতায়। আর সেই ভয় কেবল অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির নয়—বরং মানুষের তৈরি নিয়ম, প্রত্যাশা ও নিয়ন্ত্রণেরও।
সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগতা জাইনীন চৌধুরী করিম। তাঁর সঙ্গে আছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ ধীরি। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।