ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্ট ২০১৯

সুরের ইন্দ্রজালে ভাঙল মিলন মেলা

সুরের ইন্দ্রজালে ভাঙল মিলন মেলা
×

শনিবার ফোক ফেস্টের শেষ দিনে মালেক কাওয়ালের পরিবেশনা। ছবি: মামুনুর রশিদ

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ০১:১৭ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ০১:১৭

 এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। এই আনন্দের হিল্লোল তো পরক্ষণেই রাজ্যের বিষণ্ণতার ভার দর্শক-শ্রোতার মনে। শিকড়ের গানে গানে গতকাল শনিবার এভাবেই ভক্ত-শ্রোতার মনে দাগ কেটে যায় পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ড জুনুন। অন্যান্য দলের ঐন্দ্রজালিক পরিবেশনাও ছিল মনোমুগ্ধকর।

ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টের পঞ্চম আসরের সমাপনী দিনে হালের পপ ধারার সঙ্গে ফিউশনে জুনুন শোনায় পাকিস্তানের সুফি সাধক বুল্লে শাহর 'দমাদম মাস্ত কালান্দার'। এ গানের সঙ্গে দর্শক-শ্রোতারা একাত্ম হয়ে পড়েন। আলি আজমত, সালমান আহমেদরা এবার ধরলেন মন খারাপের গান। জুনুনের 'পারভেজ' অ্যালবামের 'মিট্টি মে মিল জায়েঙ্গে' গানটি শুরু হতেই দর্শকের বেজায় মন খারাপ। খানিক আগেই যে তরুণ উদ্বাহু নেচেছিলেন, সেই তরুণটির মুখাবয়বে নামল রাজ্যের আঁধার।

এমন মন খারাপে কি গান গাওয়া চলে! ঢোল আর ড্রামসের ধুনে আবার মাতিয়ে তুলল জুনুন। এবার আলি আফজাল গাইলেন 'ইয়ার বিনা দিল মেরা' গানটি। পরের গানটি রক ধাঁচের। ১৯৯৭ সালে নিজেদের চতুর্থ অ্যালবাম 'আজাদি'র প্রথম ট্র্যাক ছিল গানটি। এই এক গানেই উপমহাদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে  যায় পাকিস্তানের ফোক গানের এই ব্যান্ডটি। অ্যালবামের প্রথম গান 'সাইওনি' পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ- তিন দেশের শ্রোতাদের কাছেই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বব্যাপী 'জুনুন'-এর তিন কোটির বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার থেকে টানা তিন রাত শিকড়ের গানের সুরের মূর্ছনায় মেতে উঠেছিল রাজধানীর দর্শক-শ্রোতা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিকড়ের গানের শিল্পীদের গানে গানে ঘোর লেগেছিল রাজধানীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষের। আয়োজক প্রতিষ্ঠান জানায়, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশ থেকে ২০০ জনের বেশি লোকশিল্পী ও কলাকুশলী এবারের আসরে অংশ নিয়েছেন। সান ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ সংগীতযজ্ঞ প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে। আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানালেন, এক বছর পর আবারও দেখা হবে লোকসংগীতের এ মঞ্চে।

১৯৯৬ সালে জুনুনের মুক্তি পাওয়া 'ইনকিলাব' অ্যালবামের 'মেরা মাহি' আর 'চালে থে সাথ' গান দুটি যখন জুনুন গাইল মঞ্চে, তখন দর্শকসারি থেকে লাফিয়ে ওঠে অনেকেই। মঞ্চের কাছাকাছি থাকা অনেক শ্রোতাই হাত মেলাতে ছুটে যায়। নিরাপত্তারক্ষীদের ব্যারিকেড ডিঙিয়ে মঞ্চের কাছে শ্রোতারা যেতে না পারলেও জুনুনের ভোকাল আলি আজমত নিজেই নেমে আসেন দর্শকসারিতে। হাত মেলান অনেকের সঙ্গে। চিৎকার করে বলেন, 'আই লাভ বাংলাদেশ, আই লাভ ঢাকা।'

গতকাল শনিবার এ আসরের সমাপ্তি টানা হয় পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ড জুনুনের পরিবেশনা দিয়ে। মঞ্চে এসেই দলটি শুরু করে ওস্তাদ রাহাত ফতেহ আলির গান। ব্যান্ডের লিড ভোকাল আলি আজমত ঢাকার মঞ্চে বাংলার লোকসংগীত সাধকদের সঙ্গে পারফর্ম করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'চমৎকার মানুষ আপনারা! এখানে আসতে পেরে সত্যিই অন্য রকম লাগছে।' টানা ৯০ মিনিট গান পরিবেশন করে জুনুন।

সমাপনী দিনের প্রথম পরিবেশনা ছিল বাংলাদেশের কাওয়ালি গানের সাড়াজাগানো মালেক কাওয়ালের। আয়োজনের শেষ দিনের প্রথম আয়োজন অগ্রহায়ণের হিমেল হাওয়ার মতোই আবেশ ছড়িয়ে যায় প্রাণে। মঞ্চে ওঠে কাওয়ালির সুরের জাদুতে উপস্থিত শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখলেন মালেক কাওয়াল। পাশাপাশি গাইলেন মাইজভাণ্ডারি গানও। মঞ্চে উঠেই প্রথম গাইলেন 'ইয়া রাসুলে খোদাকে ভুল গিয়া'। এরপর একে একে গাইলেন 'ইয়া রাসুল আযম ভাণ্ডারি', 'আবার বাবা মওলানা' গানগুলো।

মালেকের কাওয়ালি ও মাইজভাণ্ডারির গানের রেশ না কাটাতে মঞ্চে আসে রাশিয়ার কারেলিয়া অঞ্চলের আলোচিত ব্যান্ড সাত্তুমা। ফোক ঘরানার এই ব্যান্ড এরই মধ্যে নিজ দেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, জার্মান, এস্তোনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করে দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। মঞ্চে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনায় দর্শককে আবিষ্ট করে রাখেন সাত্তুমার সদস্যরা। ঢাকায়ও এর ব্যতিক্রম হলো না। ঢাকার লোকসংগীতের এ আসরে প্রথমবার এসেই মাতিয়ে গেল সাত্তুমা। ভিন্নধর্মী বাদ্যের তালে তালে নাচন ধরিয়ে গেল বাঙালির মনেপ্রাণে।

সাত্তুমার পরই মঞ্চে আসেন বাংলাদেশের লালনসংগীতের শিল্পী চন্দনা মজুমদার। তার লালনের গানে মানবধর্মের কথাই ছড়িয়ে পড়ল স্টেডিয়ামে। কখনও চিন্তার গভীর এবং কখনও-বা নেচে ও হৈ-হুল্লোড় করে উপস্থিত শ্রোতারা উপভোগ করল তার গান। তিনি গাইলেন 'জগৎ মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই', 'ধন্য ধন্য বলি তারে', 'সে কি চেনে মানুষ রতন'। সর্বশেষে 'যাও পাখি বলো তারে' শোনান তিনি।


আরও পড়ুন

×