যে কোনো পরিস্থিতিতে এগিয়ে নেবে আত্মবিশ্বাস
পিনা বুশ
ফাহমিদা রিমা
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২২ | ২২:৪৮ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২২ | ২২:৪৮
পিনা বুশ। জার্মান মডার্ন ড্যান্সার, কোরিওগ্রাফার ও ব্যালে ডিরেক্টর। আধুনিক নাচের এক কিংবদন্তি। ২০০৭ সালের এক পুরস্কার বিতরণীতে তাঁর দেওয়া 'হোয়াট মুভস মি' শিরোনামের বক্তব্য থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন ফাহমিদা রিমা।
নিজের শৈশব, তারুণ্য, শিক্ষাজীবন আর নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাটানো নিজের দিনগুলোর দিকে যখন ফিরে তাকাই, তখন সব ছবি হয়ে ভেসে উঠে মনে। এসব ছবি শব্দে আর সুবাসে ভরা। অবশ্যই, সেসব মানুষেও ভরা- যাঁরা আমার জীবনকে ঘিরে ছিলেন ও আছেন। অতীত থেকে আসা স্মৃতির এ ছবিগুলো নতুন একটা জায়গা খুঁজে নিতে চায়। ফলে শৈশবের অভিজ্ঞতার অনেক অংশই আমি বড় হয়ে মেলে দিয়েছি মঞ্চে। তাই শৈশবের কথা বলা যাক কিছুক্ষণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কখনোই ভোলার নয়। ভয়াবহ বিধ্বংসের ভেতর পড়েছিল জার্মানির সুলিঙ্গান শহর। বিমান হামলার সাইরেন কানে এলে, আমাদের বাগানের ছোট্ট শেল্টারটিতে আশ্রয় নিতাম আমরা। একবার আমাদের বাড়িতেও বোমা পড়ল। যদিও আমরা সবাই অক্ষতই ছিলাম। এরপর বাবা-মা আমাকে ভুপার্টাল শহরে পাঠিয়ে দিলেন, আমার আন্টির কাছে; কেননা, সেখানে বড় শেল্টারের ব্যবস্থা ছিল। তাঁরা ভাবলেন, সেখানেই আমি নিরাপদে থাকব। সাদা সাদা বিন্দু আঁকা, ছোট্ট কালো একটা ব্যাগ ছিল আমার। সেটি সব সময়ই জরুরি জিনিসপত্রে ভরে রাখা হতো; যেন সাইরেন বেজে উঠলে, সঙ্গে নিয়ে শেল্টারে ছুটতে পারি।
চিলড্রেনস ব্যালেতে:
সুলিঙ্গানে রেস্টুরেন্টঅলা ছোট্ট একটা হোটেল ছিল আমার বাবা-মার। আমার অন্য ভাইবোনদের মতো, আমাকেও সেখানে কাজ করতে হতো। আলু ছুলে, সিঁড়ি পরিস্কার আর রুমগুলো পরিপাটি করে- এক কথায় হোটেলের টুকটুক কাজ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটত আমার। তবে পুঁচকে একটা বাচ্চা হিসেবে আমি, যখন তখন রুমগুলোতে ঘুরে আর নেচে বেড়াতাম। তা অতিথিদের চোখেও পড়ত। নিটকবর্তী থিয়েটারের কোরাস দলের সদস্যরা প্রায়ই খেতে আসতেন আমাদের রেস্টুরেন্টে। তারা প্রায়ই বলতেন, 'পিনার আসলেই চিলড্রেনস ব্যালে গ্রুপে যোগ দেওয়া উচিত।' তারপর একদিন তাঁরা আমাকে তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন থিয়েটারটির চিলড্রেনস ব্যালেতে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর।
পেটের ওপর ভর দিয়ে:
প্রথমদিনই যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল- সেটি আমি কোনোদিনই ভুলব না। পেটের ওপর ভর দিয়ে, হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে, তারপর মাথার ওপর দিয়ে পা ঘুরিয়ে আনছিল শিশুরা। সব শিশুই যে এ কাজটা করতে পারছিল ঠিকমতো তা নয়, তবে আমার কোনো অসুবিধা হলো না। আমার শিক্ষক তখন বললেন, 'তুমি একজন সত্যিকার কনশর্টনিস্ট'। একথাটার তাৎপর্য তখন বুঝিনি ঠিকই, তবু মনে হলো, যে ভঙ্গিমায় তিনি বললেন- এটির বিশেষ কোনো অর্থ রয়েছে। এরপর থেকে সেখানে নিয়মিতই হাজির থাকার তাগাদা বোধ করলাম আমি।
প্রথম মঞ্চে...:
মঞ্চে আমি প্রথম উঠি পাঁচ কী ছয় বছর বয়সে। সুলতানের হারেম ও তার প্রিয় স্ত্রীদের নিয়ে ছিল সেই সন্ধ্যার ব্যালেটি। দামি দামি খাবার আর পরিষদ নিয়ে আয়েশ করছেন সুলতান। নিগ্রোর মতো পোশাক আর সাজসজ্জা করলাম আমি; আর পুরো পারফরম্যান্সে তাঁকে বাতাস করে আনন্দ দিলাম। আরেকবার 'মাস্ক ইন ব্লু' নামের এক অপেরায় হকার-বালকের ভূমিকায় পারফর্ম করলাম। আমার উপস্থিতি হয়তো কারও নজরে পড়ত না বিশেষভাবে, তবু আমার ভালো লাগত খুব। এরপর নানা অপেরা, ড্যান্স ইভেনিং এবং বিশেষ করে ড্যান্স ইভেনিংয়ের গ্রুপ নাচে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়ল আমার। একটা ব্যাপার আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, থিয়েটারে সম্পৃক্ত থাকা ছাড়া আর কোনো কিছুই ভালো লাগত না। আর কিছু নয়, বরং নাচের প্রতিই ছিল এ টান।
কুর্ট জোসের সঙ্গে পরিচয়:
১৪ বছর বয়সে, ফোকওয়াং স্কুলে নাচের ওপর পড়াশোনা করতে এসে গেলাম আমি। সেখানে স্কুলটির যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ কোরিওগ্রাফার কুর্ট জোসের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা আমার জন্য ছিল বড় পাওয়া। পড়াশোনার সময় ভয়ানক রকম পিঠের ব্যথায় ভুগলাম আমি। নিয়মিতই ছুটে যেতে হতো ডাক্তারের কাছে। ফলে তক্ষুনি নাচ থামিয়ে দিতে বলা হলো আমাকে। নয়তো ছয় মাসের জন্য বিছানায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কী করব আমি? ঠিক করলাম, নাচ থামাব না। এটি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল।
নিজেকে শান্ত রাখার আত্মবিশ্বাস:
১৯৫৮ সালে ফোকওয়াং পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পেলাম। এ জন্য নিজের একটি ছোট প্রোগ্রাম করার দরকার ছিল আমার। প্রেজেন্টেশনের দিনটি চলে এলো; আমি গিয়ে দাঁড়ালাম মঞ্চে। আমি পজিশন নিতেই আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু কিছুই ঠিক নেই। পিয়ানিস্ট তখনও আসেননি। পুরো হলে বেশ উত্তেজনা; অথচ কোথাও পিয়ানিস্টের দেখা নেই। নিজের পোজ নিয়ে, মঞ্চে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখলাম। পিয়ানিস্টকে যতক্ষণে খুঁজে পাওয়া গেল, সময় বয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এতক্ষণ ধরে পোজ দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার ফলে নিজের মধ্যে ধৈর্যের এক অন্য রকম গুণ আবিস্কার করলাম। মিউজিক যখন শুরু হলো, নাচতে শুরু করে দিলাম। আর বুঝে গেলাম, যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখার আত্মবিশ্বাস আমাকে এগিয়ে নেবে।
নিজের এ গুণটির প্রতি সারাজীবন ভরসা রেখেছি আমি।
