ফাহমিদা আজিমের হাত ধরে এলো পুলিৎজার
ফাহমিদা আজিম ছবি : অনলাইন
ফাহমিদা রিমা
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২২ | ২৩:৩১
২০২২ সালে সাংবাদিকতার নোবেলখ্যাত পুলিৎজার পুরস্কার জিতেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম মার্কিন নাগরিক ইলাস্ট্রেটর ও গল্পকার ফাহমিদা আজিম। How I Escaped a Chinese Internment Camp শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য এই পুরস্কার জেতেন তিনি। ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইনসাইডার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় এই প্রতিবেদন। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে 'সামিরা সার্ফ' বইয়ের জন্য 'গোল্ডেন কাইট' পুরস্কার জিতেছিলেন ফাহমিদা আজিম। ইলাস্ট্রেটরের পাশাপাশি ফাহমিদা একজন গল্পকারও। মূলত সংস্কৃতি ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর কাজ করেন তিনি। বিভিন্ন নামি গণমাধ্যমে তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদও সম্পাদনা করেছেন ফাহমিদা। এমনকি নিজের Muslim Women Are Everything' বইটিরও প্রচ্ছদ এঁকেছেন ফাহমিদা।
সঙ্গী আরও তিন
সাংবাদিকতা ও প্রকাশনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রতি বছর সাংবাদিকতার নোবেলখ্যাত পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয়। ইলাস্ট্রেটেড রিপোর্টিং অ্যান্ড কমেন্টারি বিভাগে এ বছর ফাহমিদা আজিমের সঙ্গে পুরস্কার জেতেন মার্কিন গণমাধ্যম দ্য বিজনেস ইনসাইডারের অ্যান্থনি ডেল কোল, জশ অ্যাডামস এবং ওয়াল্ট হিকি। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হাউ আই এসকেপড অ্যা চায়নিজ ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্প বা যেভাবে চীনা বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসেছি শীর্ষক কমিক স্ট্রিপের জন্য এ পুরস্কার জেতেন তাঁরা। রাজনৈতিক সূক্ষ্ণ দৃষ্টি, সম্পাদকীয় দক্ষতা, জনসেবার মূল্য বহন করা এডিটোরিয়াল কার্টুন ও অন্যান্য আলংকারিক কাজের জন্য পুরস্কারটি দেওয়া হয়। পুরস্কারের অংশ হিসেবে বিজয়ীদের দেওয়া হবে ১৫ হাজার ডলার।
উইঘুরে নির্যাতন ও জুমরাত দাউত
চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ও জুমরাত দাউত নামের এক মুসলিম নারীর চীনা ক্যাম্প থেকে পালানোর গল্প কার্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এই কমিক স্ট্রিপে। জুমরাতের বিজনেস ইনসাইডারকে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে মূলত কমিকটি তৈরি করা হয়েছে। এই কমিক স্ট্রিপের কার্টুনগুলো এঁকেছেন ফাহমিদা আজিম। ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইনসাইডারে তাঁদের কমিক স্ট্রিপ প্রকাশিত হয়।
বেড়ে ওঠা
ফাহমিদা ছয় বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় পাড়ি জমান। ভর্তি হন ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি স্কুল অব আর্টসে। সেখান থেকেই কমিউনিকেশনস আর্টে স্নাতক শেষ করেন। লেখাপড়ার শুরু থেকেই তিনি চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বর্তমানে তিনি ওয়াশিংটনের সিয়াটলে স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর আগ্রহ মানুষের বিশেষ বৈচিত্র্যময় জীবনযাপনের ওপর। সেই প্রতিপাদ্যকে কাজে লাগিয়ে তিনি আঁকেন এবং লেখালেখি করেন। এমনকি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মানুষদের খাদ্যাভ্যাসকেও তিনি তাঁর লেখায় ও আঁকায় তুলে ধরেন। তাঁর চেতনায় সব সময় উজ্জীবিত থাকে মুসলিম নারীর অধিকার ও মর্যাদা।
উপন্যাসের খোঁজে
আমিরাস পিকচার ডে শিরোনামের বইয়ের অলংকরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের বইভিত্তিক অনলাইন হলিডে হাউসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, প্রিয় বই ও বাংলাদেশ সম্পর্কে ফাহমিদা আজিম বলেন, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের দ্য লিটল মারমেইড আমার শৈশব অনেকটা রাঙিয়ে দিয়েছিল। পরে রুথ ওজেকি, অরুন্ধতী রায়, অক্টাভিয়া বাটলার পড়েও মুগ্ধ হয়েছি। বেশ কিছুদিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস 'তোমাকে' খুঁজছি। এই বইটি পড়ার খুব ইচ্ছে। কারণ বইটি আমার মায়ের প্রিয়। আসলে আমি আমার পছন্দের বা প্রিয় কোনো বইয়ের কথা মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না। মায়ের পছন্দের এই বইটি পড়ে অন্তত মায়ের সঙ্গে তাঁর পছন্দের বইয়ের গল্প করতে পারব। ফাহমিদা আরও বলেন, বাংলাদেশ ছেড়ে শৈশবেই যুক্তরাষ্ট্রে আসি। এখানে আসার পর ভর্তি হই স্কুলে। স্কুলে যাওয়ার পর সবাই যখন পছন্দের খাবারের নাম বলত, সেসবের কিছুই বলতে পারতাম না। ফলে লজ্জা লাগত। পরবর্তী সময়ে খাবারের কথা বলতে গেলে আমার মধ্যে এক ধরনের জড়তাও কাজ করে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার সেই ধারণা বদলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের খাবারসহ স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত খাবারই আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে। এর জন্য আমার পরিবার এবং দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ।
যেভাবে লেখালেখি এবং আঁকায়...
ফাহমিদা বলেন, আঁকাআঁকি কিংবা লেখালেখি আমার তেমন ভালো লাগত না। কেননা শৈশবের বেশিরভাগ সময় আমাকে চিকিৎসক হওয়ার জন্য পরিবার থেকে চাপ দেওয়া হতো। এই চাপ বাড়তে থাকলে একসময় আমার কাছে মনে হয়, লেখালেখি কিংবা আঁকাআঁকিতেই থাকতে পারি আমি। তখন আমি অনেক বই পড়তাম এবং কার্টুন দেখতাম। হয়তো এজন্যই মনে এমন বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, আমি কোনো রকম বিশ্রাম ছাড়াই প্রচুর ছবি আঁকতে পারতাম। তবে আমার কাছের মানুষ আমাকে বলতে থাকেন, শিল্পীরা নিঃস্ব হয়ে মারা যান। ফলে তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিবর্তন করা উচিত। তা ছাড়া সদ্য বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় আসা আমার বাবা-মা কোনোভাবেই চাইতেন না, তাঁদের সন্তান ছবি এঁকে বখে যাক।
স্বপ্ন উস্কে দেওয়া শিক্ষক
আমি যখন পরিবার এবং নিজের সিদ্ধান্তের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই আমার ষষ্ঠ শ্রেণির আর্ট শিক্ষক বলেছিলেন, তুমি আঁকাআঁকিতে ভালো করতে পারবে। তোমার মধ্যে আমি নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখছি। তিনি আরও বলেছিলেন, ভবিষ্যতে একদিন আমি তোমার নাম গুগল করব এবং তোমার কাজও খুঁজে পাব গুগলে। স্যারের মুখে এমন কথা শুনে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। তবে এই ভয়ও মনে কাজ করত যে সিদ্ধান্তটা আসলেই কঠিন। আমি যদি এর বাস্তবায়ন না ঘটাতে পারি! তবে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।
আগামীর স্বপ্ন
১৯১৭ সাল থেকে পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালে রয়টার্সের পাঁচ ফটো সাংবাদিকের সঙ্গে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী পনির হোসেন। তবে ফাহমিদা হচ্ছেন প্রথম কোনো বাংলাদেশি-আমেরিকান, যিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেলেন। নিশ্চয়ই তাঁর দেখানো পথে হাঁটবেন তরুণরা- এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
- বিষয় :
- ফাহমিদা আজিম
- পুলিৎজার
