আমদানিনির্ভরতা কাটছে না চিনির
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৪:১০
আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। রোপণ থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত সময় লাগে সাধারণত এক থেকে দেড় বছর। এই লম্বা সময়ে একই জমিতে তিন-চারটি ফসল ফলানো যায়। সেগুলোতে আয়ও তুলনামূলক বেশি হয়। এ কারণে আখ চাষে ততটা উৎসাহী নন কৃষক। এতে কমছে চিনির উৎপাদন। কিন্তু প্রতিবছর চিনির চাহিদা বাড়ছে ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে। ফলে চাহিদার প্রায় পুরো অংশই মেটাতে হয় আমদানি করে। এই আমদানিনির্ভরতা কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থা রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। ফলে চিনির বাজার মাঝেমধ্যেই হয়ে ওঠে বেসামাল।
এ খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, চিনির আমদানিনির্ভরতা সহজেই কাটানো সম্ভব নয়। তবে দেশে আখের চাষ বৃদ্ধি ও চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন করা গেলে চিনির উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো যায়। তাতে অন্তত বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া কিছুটা রোধ করা সম্ভব হবে। সেজন্য আখের উন্নত বীজ সংগ্রহ, কৃষককে সার্বিক সহায়তা ও আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা দরকার।
আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক
আখ চাষের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে সমকাল থেকে চুয়াডাঙ্গা ও জামালপুরের কয়েকজন চাষির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ত?াদেরই একজন জামালপুর দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পোল্লাকান্দি গ্রামের কৃষক ফিরোজ মিয়া বাবু। তিনি আগে চার একর জমিতে আখ চাষ করতেন। চাষ কমিয়ে এখন করেন দুই একরে। প্রতি বিঘায় আখের চেয়ে অন্য ফসল উৎপাদন করে কীভাবে বেশি অর্থ আয় করা যায় বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে আনুমানিক একটি হিসাবও দিয়েছেন ফিরোজ মিয়া। তিনি এবার ৩৩ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেন। এতে আখ উৎপাদন হয় ২৮০ মণ। প্রতি মণ ১৮০ টাকা করে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ৫০ হাজার ৪০০ টাকা। এ ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে তাঁর লাভ হয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।
কাছাকাছি জায়গায় একই পরিমাণ জমিতে এই ১৫ থেকে ১৮ মাসে তিনি ধান, পাট ও ভুট্টা- এই তিনটি ফসল ফলিয়েছেন। এর মধ্যে প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছেন ২০ মণ, যা বিক্রি করে পেয়েছেন ২৫ হাজার ৪০০ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে তাঁর আয় হয়েছে ২০ হাজার ৪০০ টাকা।
তবে ভুটা চাষে খরচ কিছুটা বেশি হয়। ভুটা চাষে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ করে পেয়েছেন প্রায় ৩৫ মণ। বিক্রি থেকে এসেছে ৪৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ এতে ভুট্টায় তাঁর আয় হয়েছে ৩৫ হাজার ৭৫০ টাকা।
এ ছাড়া পাট উৎপাদন করেছেন প্রায় ৭ মণ। পাটে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। বিক্রি করে পেয়েছেন ১৯ হাজার ৬০০ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে পাটে তাঁর আয় এসেছে ১৫ হাজার ৬০০ টাকা।
এই তিনটি ফসল থেকে তিনি মোট পেয়েছেন ৭১ হাজার ৭৫০ টাকা। সেই হিসাবে ধান, পাট ও ভুট্টা- এ তিনটি ফসল থেকে আখের তুলনায় তাঁর প্রায় ৩৬ থেকে ৪১ হাজার টাকা বেশি আয় হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। আয়ের এ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, আখে যদি লাভ কমই হয়, তাহলে কষ্ট করে কৃষক আখ চাষ করবেন কেন? তাই উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁর মতো অন্য কৃষকরাও।
প্রায় একই ধরনের মত দিয়ে চুয়াডাঙ্গা উপজেলার কৃষক সাইফুল আজম মিন্টু বলেন, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি থেকে যে জমি লিজ দেওয়া হয় সেগুলোতে শুধু আখ চাষ করা হয়। কারণ কোম্পানির শর্ত থাকে জমি লিজ নিয়ে আখ চাষ করতে হবে। তবে নিজের জমিতে বেশিরভাগ মানুষ চাষ করে না। কারণ আখে লাভ কম। এর চেয়ে অন্য ফসলে অনেক বেশি লাভ করা সম্ভব।
আখ চাষে কৃষকের আগ্রহ কমার ফলে কমে গেছে আখ চাষের আওতায় থাকা জমি ও উৎপাদনের পরিমাণও। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২২ অনুযায়ী, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে আখ উৎপাদন হয় ৭৬ লাখ ৮২ হাজার টন। ২০০০-২১ অর্থবছরে যা কমে দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার টনে। সেই হিসাবে দুই-তিন দশকে আখের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। একই সময়ে আখ চাষাবাদের জমির পরিমাণও কমেছে অর্ধেকের বেশি। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭২ হাজার একর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার একর।
আখের স্বল্পতায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বন্ধ চিনিকল
আখের অভাবে কমছে চিনি উৎপাদন। সম্প্রতি আখের অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জিলবাংলা সুগার মিলের। চলতি মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটিতে ৬৮ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৪ হাজার ৭৬০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেজন্য ৬০ দিন আখ মাড়াইয়ের কথা ছিল। গত বছরের ২ ডিসেম্বর থেকে মাড়াই শুরু হয়। কিন্তু ৪১ দিন আখ মাড়াইয়ের পর গত ১২ জানুয়ারি কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। সে পর্যন্ত ৩৫ হাজার ১৭১ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৩২২ টন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কারখানাটিতে চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি।
চলতি মৌসুমে ৫৩ কার্যদিবস আখ মাড়াই করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ৪২ দিন পরই আখ মাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির। চাহিদা অনুসারে আখ না পাওয়ায় ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে আখ মাড়াই বন্ধ রয়েছে। একইভাবে আখের অভাবে ২৫ কর্মদিবসের জায়গায় ১৯ কর্মদিবসে বন্ধ হয়ে গেছে জয়পুরহাট চিনিকলের মাড়াই।
এ ব্যাপারে জিলবাংলা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসান সমকালকে বলেন, চাষিরা আখের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁরা আখের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুল আজম বলেন, চিনিকলের কাছে কোনো চাষির বকেয়া নেই। এর পরও চাষিরা চিনিকলে আখ দিচ্ছেন না। তাঁরা আখ বিক্রি করছেন গুড়ের কারখানায়। অথচ এ বছর তাঁদের যে পরিমাণে আখ উৎপাদন হয়েছে সেগুলো চিনিকলে সরবরাহ করলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে চিনিকলে উৎপাদন বন্ধ হতো না। মূলত কৃষকদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা কম। তাঁরা যে ফসলে বেশি মুনাফা পান, সে ফসল উৎপাদনে মনোযোগী।
সরকারি মিলে উৎপাদন
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৮ হাজার লাখ টন চিনি উৎপাদন হয়। ওই সময় ১৫টি চিনিকল উৎপাদনে ছিল। লোকসানে থাকায় ২০২০ সালে ছয়টি চিনিকল বন্ধ করা হয়। কিন্তু লোকসান থেকেই যাচ্ছে। উৎপাদনও প্রতিবছরই কমছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে চিনির উৎপাদন কমে হয় ২৪ হাজার ৫০০ টন। এখন আরও তলানিতে নেমেছে উৎপাদন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালু থাকা ৯টি চিনিকলে চিনি উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২১ হাজার ৩১৩ টন। বর্তমানে বিএসএফআইসি কাছে বিক্রয়যোগ্য চিনি মজুত আছে ১৭ হাজার ৭১০ টন।
আখ থেকে চিনি আহরণে পিছিয়ে বাংলাদেশ
দশে আখ থেকে চিনি উৎপাদনের হার খুব কম। চিনিকলগুলোর তথ্যমতে, প্রতি ১০০ টন আখে চিনি পাওয়া যায় ৬ থেকে ৮ টন। অর্থাৎ ৬ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সংগ্রহ করা যায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি চিনি আহরণ করা যায় চীনের আখ থেকে। দেশটির হাইব্রিড আখ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত চিনি সংগ্রহ করা যায়। এ ছাড়া ব্রাজিলে ১৪ এবং কিউবায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত চিনি সংগ্রহ করা যায়।
চাহিদা ও আমদানি
উৎপাদন কমলেও দেশে চিনির চাহিদা বাড়ছেই। বেভারেজ, ওষুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে চিনির ব্যবহার বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে চিনির চাহিদা রয়েছে ১৮ থেকে ২০ লাখ টন। তবে চিনি আমদানিকারক ও পরিশোধনকারীরা এ তথ্য মানতে নারাজ। তাঁদের ধারণা, দেশে চিনির চাহিদা ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন। এর প্রায় পুরোটাই আমদানি হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিনির আমদানিনির্ভরতা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। এর পর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের চিনি আমদানি হয়েছে।
বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, জমির উর্বরতা কমছে। উন্নত বীজ নেই। ফলে বাংলাদেশে আখ থেকে তেমন চিনি সংগ্রহ করা যায় না। তাই চিনির আমদানিনির্ভরতাই থাকবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে চিনিতে শুল্ক্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।
আখ চাষ বাড়ানোর তাগিদ অর্থনীতিবিদদের
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে ১৬টি চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টির উৎপাদন বন্ধ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত অর্থবছর (২০২১-২২) পর্যন্ত এসব চিনিকলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, চিনিকলগুলো সচল থাকলে আমদানিনির্ভর হয়ে থাকতে হতো না। সংকটও সৃষ্টি হতো না। দামও থাকত সহনীয় পর্যায়ে। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার কারণে চিনিকলগুলো পরিণত হয়েছে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সরকারি চিনিকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার বিকল্প নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে এসব কারখানাকে আধুনিকায়ন করে চিনিতে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, একসময় সরকারি চিনিকলে প্রায় ২ লাখ টন চিনি উৎপাদন হতো। বাজারে যখন চিনির দামে অস্থিরতা দেখা দিত, তখন সরকার খোলাবাজারে চিনি ছেড়ে বাজার স্বাভাবিক রাখত। কিন্তু বর্তমানে সে পরিস্থিতি নেই। চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে গুটি কয়েক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
আমদানিনির্ভরতা কাটানো সম্ভব না হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চিনিকল আধুনিকায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালু করা দরকার। অনেক বয়স হয়ে যাওয়ায় চিনিকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। সেগুলোকে মেরামত করার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সংযোজন করতে হবে।
কৃষকদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, তাঁরা আখ চাষে বিমুখ হচ্ছেন। লোকসানের কারণে ঝুঁকছেন অন্য ফসলে। যেহেতু কৃষি জমির পরিমাণ কমছে তাই উন্নতমানের বীজ আনা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- চিনি
- আখ
- বিএসএফআইসি
- শিল্প মন্ত্রণালয়
