ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দর্শন ও ক্যালকুলাস

চিন্তার ইতিহাসে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা

চিন্তার ইতিহাসে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা
×

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

অনন্ত বা অসীমের ধারণা আর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা ইনফিনিটেসিমালের ধারণা দুটোই ঝামেলার। মানুষের মনে অসীম-অনন্তের ধারণার প্রথম বীজ উপ্ত হয় মহাকাশের অনন্ত ব্যাপ্তি চাক্ষুষ দেখে। সে মহাকাশ দেখে, সে নক্ষত্র দেখে, সে পর্যবেক্ষণ করে, সে পরিমাপ নেয়। সে বুঝতে পারে, মহাবিশ্ব বিপুল এবং কোনো কোনো অর্থে নিঃসীম। এটা মোটামুটি বেশ প্রত্যক্ষ একটা অসীম। পক্ষান্তরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা বেশ অ্যাবস্ট্রাক্ট। অসীমের গাণিতিক বিশ্লেষণ যদিও বিমূর্ত, কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণাও কম বিমূর্ত নয়। এটা যে আছে, এটা অস্তিবান, কিংবা এটা যে থাকতে পারে - - এটাও বিমূর্ত ব্যাপার। দুই চূড়ান্ত সীমানায় – একটা অনন্ত অসীম, আরেকটা ক্ষুদ্রের চেয়েও ক্ষুদ্র, যদৃচ্ছ ক্ষুদ্র – দুটি অসীমের অস্তিত্ব মানুষের ভাবুক মনকে ভাবিয়েছে। অতিক্ষুদ্রের ধারণাও একটা বিচিত্র ধারণা। ক্ষুদ্রের চেয়েও ক্ষুদ্র - - যতখানি ভাবা যায় তার চাইতেও ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, কিন্তু শূন্য নয় অথচ ধনাত্মক সংখ্যা এবং মানুষের সসীম চিন্তার চাইতেও ক্ষুদ্র। গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের অনেকেই অসীম ক্ষুদ্রের ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন। যেমন অ্যারিস্টটল (384–322 BC), ডেভিড হিউম (১৭১১-৭৬), বার্ট্রান্ড রাসেল (1872 –1970)। রাসেল বলেছেন, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা একটি ‘অপ্রয়োজনীয়, ভুল এবং স্ববিরোধী’। তবু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা ইনফিনিটেসিমালের ধারণা জরুরি একটা ধারণা। এটা একইসাথে শক্তিশালী ধারণা এবং খুব দরকারিও। এটা ছাড়া ক্যালকুলাস এগোয় না। ক্যালকুলাস আমাদের প্রায়োগিক জীবনে এত সাহায্যে আসে যে একে ছাড়া আমরা চলতেই পারি না। মোবাইল ফোন বলেন, কমপিউটার বলেন, বাজার অর্থনীতি বলেন, জিপিএস বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বলেন  - সবেতেই ক্যালকুলাসের প্রয়োগ আছে। এভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা আমাদের জীবনকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করে যাচ্ছে। কিন্তু চিন্তার দিক দিয়ে এর অস্তিত্ব ছিল কণ্টকাকীর্ণ। অথচ এই চিন্তার বীজই ভৌত সত্য অনুধাবনে আমাদের সাহায্য করেছে, ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়নের প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবও এনে দিয়েছে। উনিশ শতকে তো একে বাতিলের খাতায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমরা জানি, ইনফিনিটেসিমালের আইডিয়া কতখানি জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটা কতখানি বাস্তব?
    সত্তার অস্তিত্বের মূল প্রশ্নের অনুসন্ধানে গ্রিক চিন্তাবিদদের ধারণায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের আইডিয়া আসে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। তাঁরা সত্তার মূল উপাদানের খোঁজ করতেন চিন্তার সাধনায়। এই অনুসন্ধানের একদিকে ছিলেন পারমেনাইডিস এবং তাঁর অনুসারীরা। এঁরা বলতেন, সত্তা অবিভাজ্য এবং ‘পরিবর্তন’ বলে কিছু নাই। ‘বদল’ বলতে আমরা যা দেখি তা সবই মায়া। এঁরা মোনিস্ট বা অদ্বৈতবাদী ঘরানার। এঁদের বিপরীতে ছিলেন ডেমোক্রিটাস (460 – 370 BC) ও তদীয় অনুসারীরা যাঁরা সত্তা ভাঙতে ভাঙতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের পর্যায়ে চলে যেতেন। এঁরা অ্যাটমিস্ট বা পরমাণুবাদী। এঁরা এবং পিথাগোরীয় সম্প্রদায়ভুক্ত দার্শনিকেরা পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। এঁদের মত অনুসারে দৃশ্যমান সত্তাকে ভাঙতে ভাঙতে আপনি এক অতিক্ষুদ্র ‘পরম অণুতে’ পৌঁছবেন, যার পর আর ভাঙতে পারবেন না। এটা সত্তার অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম মৌলিক উপাদান, এটাকে ওঁরা ‘অ্যাটম’ বলতেন। এই পরমাণু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, যথা ইচ্ছা ক্ষুদ্র আপনি এটাকে ভাবতে পারেন। কিন্তু ঠিক শূন্য নয়। এই সম্মিলিত চিন্তা-স্কুলের নাম প্লুরালিস্ট বা বহুত্ববাদী। বহুত্ববাদী আর অদ্বৈতবাদীদের নিরন্তর বিতর্ক থেকে পারমেনাইডিসের শিষ্য ইলিয়া’র জেনো (495 – 430 BC) এমন সব ‘প্রমাণ’ এবং ‘হেঁয়ালি’ নিয়ে হাজির হলেন যাতে গতির সব ব্যাপারকেই উড়িয়ে দিলেন। তিনি দেখালেন একিলিস, যিনি কিনা দ্রুততম মানব, কিছুতেই কচ্ছপকে টপকে যেতে পারবেন না। এসব ধাঁধা ‘ফালতু’ বলে অ্যারিস্টটল উড়িয়ে দিলেও এর মধ্যে রয়েছে চিন্তার খোরাক। অন্তত বার্ট্রান্ড রাসেল এদেরকে অতীব সূক্ষ্ম ও গভীর চিন্তার উদ্রেককারী বলে সনদ দিয়েছেন। এর বিপরীতে অ্যারিস্টটল বলেছেন, শূন্যস্থান বা স্পেসকে যত ইচ্ছা ছোট ভাগে ভাগ করতে পার কিন্তু অসীমভাবে ভাগ করতে পারবে না। অ্যারিস্টটলের এই অসীম-ত্যাগী মনোভাগ গ্রিক চিন্তায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছিল। এমনকি তাঁর শতবর্ষ পরে রচিত ‘এলিমেন্টস’-এও ইউক্লিড (৩২৫-২৬৫ খ্রি. পূ.) জ্যামিতির ভাবনা থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণাকে দূরে রাখেন। অসীম-ক্ষুদ্র, অর্থাৎ অসীম ভাবে ক্ষুদ্র, হল ক্ষুদ্র করতে করতে অসীমে চলে যাওয়া - একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণা। আমরা সচরাচর মহাশূন্যকে অসীম ভাবি, দেখি। এই অনন্তকে আমরা চাক্ষুষ দেখি, কিন্তু অসীম-ক্ষুদ্রকে দেখা যায় না, কেবল চিন্তায় ধরা যায়। সংখ্যা এবং রূপের মধ্যকার যে-গ্যাপ কিংবা স্থিতি ও গতিশীলতার মধ্যে যে পার্থক্য – এই গ্যাপগুলোকে পূরণ করতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণাকে কাজে লাগে। জ্যামিতিতে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ কিংবা বহুভুজের ক্ষেত্রফল যেমন সহজে গণনা করা যায়, বৃত্তের ক্ষেত্রফল তেমন সহজে যায় না। কেননা এটি বক্ররৈখিক। বৃত্তকে অনেকগুলো ছোট ছোট বহুভুজে বিভক্ত কল্পনা করে নিয়ে তাদের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করে তারপর সর্বমোট ক্ষেত্রফল নির্ণয় করা হয়। এভাবে নির্ণীত ক্ষেত্রফল তত সঠিক হবে, আপনি ঐ কল্পিত বহুভুজগুলো যত ছোট এবং বেশি সংখ্যায় নেবেন। ঠিক এভাবেই খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে আর্কিমিডিস (287 – 212 BC) বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করেন। কিন্তু একাজেও ইউক্লিডের অসীম-ত্যাগী মনোভাব অক্ষুণ্ন রাখতে গিয়ে আর্কিমিডিস অসীমভাবে ক্ষুদ্রতার আইডিয়া বাদ দিয়ে ব্যতিরেকী প্রমাণের (reductio ad absurdum) মাধ্যমে p-রাশির সাহায্যে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে প্রয়াসী হন। তিনি অসীমভাবে ক্ষুদ্র বহুভুজ না নিয়ে সসীমসংখ্যক বহুভুজ নিয়ে তাদের বাহুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে কাজটি করেন। এজন্য একে method of exhaustion বলে। যাহোক ইনফিনিটেসিমালের ধারণা বাদ দিয়েও জ্যামিতি করা যায়। কিন্তু সেটা প্রাণহীন মনে হয়। মনে হয় যেন বন্ধ্যা বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। মুক্তভাবে পতনশীল বস্তুর যেমন প্রতিক্ষণে গতি বদলায় – এমন গতিশীল সিস্টেমের জন্য স্থিতির জ্যামিতি কোনো কাজে আসে না।  instantaneous speed বা তাৎক্ষণিক গতির কোনো জায়গাই অ্যারিস্টটল দেন নাই, ইউক্লিডও নয়। এভাবে গ্রিক বিজ্ঞান প্রকারান্তরে বর্ণনাত্মক রয়ে যায় এবং অতি-মাত্রায় প্রমাণ-নির্ভরতায় হারিয়ে যায়। ফলে গ্রিক বিজ্ঞান একটিমাত্র বৈজ্ঞানিক বিধিও আবিষ্কার করতে পারেনি, সম্ভাবনা থাকা সত্বেও।
তবে প্লেটোর (424/423 – 348/347 BC) চিন্তায় অতিক্ষুদ্রের ধারণার বীজ রয়েই যায়। পরে তাঁর ভাবশীষ্যগণ – প্লটিনাস (204/5 – 270 খ্রিষ্টাব্দ) বা সেন্ট অগাস্টিন (354 – 430 খ্রিষ্টাব্দ) অসীম-ক্ষুদ্রতাকে আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে নিয়ে যান। বলতে থাকেন ‘উহাই ঈশ্বর’। মধ্যযুগের দার্শনিকেরা অসীম-ক্ষুদ্রতাকে নিয়ে মরমী বিতর্কে লিপ্ত হন। এভাবে রেনেসাঁর সময়ে মরমীবাদের আড়ালে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণা ক্রমে আলোচনায় ফিরে আসে। যেমন কেপলার (1571–1630), গ্যালিলেও (1564 –1642) এবং ফের্মা (1607–65) ইনফিনিটেসিমালের মরমী ধারণাকে কাজে লাগিয়ে গতি-সংক্রান্ত সূত্র প্রণয়ন এবং গতিশীল ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেপলার সরলরেখা ও বক্ররেখার মধ্যবর্তী পার্থক্যের সেতুবন্ধ হিসেবে অসীম-ক্ষুদ্রের ধারণা ব্যবহার করেছেন। স্থান ও কালের অসীমভাবে বিভাজিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের মধ্য দিয়ে চলমান বস্তুর গতির ধারণায় গ্যালিলেও প্রমুখ কৌতূহলী ছিলেন। এভাবে বন্ধ্যা জ্যামিতিকে এড়িয়ে তাঁরা উর্বর আধুনিকতার দিকে ধাবিত হলেন, বলা চলে। তাঁরা আসলে জ্যামিতিক পদ্ধতির অতি-ঘোরালো আরোহী-যুক্তির অসংখ্য ঘূর্ণি এড়িয়ে দ্রুত সমাধানে পৌঁছনোর পদ্ধতি খুঁজছিলেন – এমন একটি পদ্ধতি যা গাণিতিকভাবে জোরালোও হবে, আবার বৌদ্ধিকভাবে অর্থবহও হবে। সোনার পাথরবাটি মত একটা আরকি। এই আধুনিকতার জ্যামিতির মত গাণিতিক সৌকর্য (rigor) ছিল না, এবং তা খানিকটা উদ্ভট এবং বাধাবন্ধনহীন রয়ে যায়। কিন্তু তবু এটি একটি উর্বর সম্ভাবনা নির্দেশ করে। তবে অসীমের ভেতরে ঈশ্বরের উপস্থিতি কল্পনার মধ্যযুগীয় চিন্তার ধারাবাহিকতায় এমন প্রশ্নও ওঠে যে প্রকৃতির এই গতির মধ্যে, গ্রহের সংগীতে তথা ভৌত বাস্তবতায় তাহলে ঐশ্বরিক উপস্থিতি কীভাবে প্রবেশ করে? এই ভাবধারাটি বেশ পপুলার। এক মার্শাল আর্ট গুরু আমাকে একবার চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, দুই আর তিন – এর ভেতরে কী আছে তা যদি তুমি আমাকে বলতে পার তাহলে আমি তোমাকে দর্শন ব্যাখ্যা দেব। আমি জানি না তিনি ঠিক কী প্রতিপাদন করতে চাইছিলেন, তবে অসীম ধারার রহস্যবাদ থেকে মানবমন খুব সহজে রেহাই পায়নি, এমনকি দেদেকিন্দ (1831–1916) বা ক্যান্টরের (1845–1918) অবদানের পরও নয়, যেটা সেই মধ্যযুগীয় অসীম-সংক্রান্ত তুরীয় ভাবনারাজির প্রত্যক্ষ উত্তরসুরী বলে আমার মনে হয়।
ব্লেইজ পাসকাল (1623–1662) অসীমের অভ্যন্তরে ঐশ্বরিকতার প্রভাব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তাঁর লেখায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের প্রতি তাঁর সহজাত মুগ্ধতা প্রকাশ পায়। অবশ্য তিনি একাধারে গণিতবিদও ছিলেন। বক্রাকৃতির ঘনবস্তুর ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে তিনি ইনফিনিটেসিমালের ব্যবহার করেছিলেন। যখনই সঠিক মানের দেখা মিলত বা আভাস পাওয়া যেত, তখনই তিনি অসীমভাবে ক্ষুদ্র বিভাজনকে ‘অতি-সামান্য’ বা নেগলিজিবল বলে সসীম ফলাফলে থিতু হতেন। পাসকালের এই কৌশলকে দেকার্তে (1596–1650) কখনই পছন্দ করেননি। তবে তাঁরা জ্যামিতির আনুগত্য একেবারে কখনোই ত্যাগ করেননি। ১৬৬০ ও ১৬৭০-এর দশকে আইজ্যাক নিউটন (1642–1727) ও গটফ্রিড লিবনিজের (1646–1716) কাজে আমরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের পরিপূর্ণ ব্যবহার এবং এর ভিত্তিতে গণিতের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ক্যালকুলাসের উতপত্তি দেখতে পাই। চিরায়ত যুগের ‘জ্যামিতিকায়ন’ এভাবে ‘আধুনিক যুগের’ গণিতায়নে প্রবেশ করে।
নিউটন তাঁর নবাবিষ্কৃত ক্যালকুলাস দিয়ে ভৌত জগতের হারানো সুর খুঁজে পেলেন। যদিও নিউটনের তুলনায় লিবনিজের এনালিসিস আরও পরিপক্ব ছিল। আজও আমরা তাঁরই দেখানো পথে ক্যালকুলাস শিখে থাকি। তাৎক্ষণিক বা মৌহূর্তিক গতিবেগ (instantaneous velocity) কে নিউটন fluxion বলেছেন। একে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছিলেন অতিক্ষুদ্র সময়ে অতিক্রান্ত অতিক্ষুদ্র দূরত্বের অনুপাত হিসেবে। এইসব আলোচনার সাপেক্ষে নিউটন দেখাতে সক্ষম হলেন যে গ্রহগুলো একটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। এই সূত্রটি কেপলার টাইকো ব্রাহের (1546–1601) পর্যবেক্ষণ উপাত্ত ব্যবহার করে নির্ধারণ করেছিলেন। অর্থাৎ কেপলারের এমপিরিকাল সূত্রকে নিউটন মূলনিয়মে নির্ধারণ করে দেখালেন। এই যে প্রকৃতি যে গণিতের সূত্র মেনে চলছে, ভৌতবস্তুর প্রকৃতি গাণিতিকভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে – এটাই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করে আর নিউটনকে করে আলোকায়নের অগ্রদূত। অ্যারিস্টটলের টেলিওলজি-ভারাক্রান্ত বিশ্ববীক্ষা থেকে টেনে এনে একটি দ্বান্দ্বিক বিশ্ব-সিস্টেম সৃষ্টিতে নিউটন, লিবনিজ ও তাঁদের সৃষ্ট ক্যালকুলাসের একটা ভূমিকা ছিল। রহস্যে মোড়ানো চিন্তা থেকে যুক্তিকতায় বা আরো বৃহৎ অর্থে র‍্যাশনালিটিতে এই প্রত্যাবর্তনে পর্যবেক্ষণ-শাস্ত্র, গাণিতিক মডেল-নির্মাণ ও ক্যালকুলাস-সদৃশ গাণিতিক প্রজ্ঞার নির্মাণ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবু কথা থাকে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আসলে কী বস্তু? এটা কি বাস্তব? ক্ষুদ্র বুঝলাম, কিন্তু কত ক্ষুদ্র? চিন্তা সর্বগ্রাসী, কিন্তু তবু এর তো একটা সীমা থাকা দরকার! বলা হচ্ছে, ইনফিনিটলি স্মল, যত ছোট ভাবতে পারা যায় তত ছোট, কিন্তু ঠিক শূন্য নয়। এই জিনিসটা গুপিগাইন-বাঘাবাইনের ভূতের রাজার মত শোনায় - - একইসাথে সেটা রহস্যময় অথচ ফাইনাইট বা সসীম, বাস্তবসম্মত থেকেও বিমূর্ত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের যেকোনো বাস্তব কল্পনার চেয়েও তা ক্ষুদ্র। এই ভৌতিক কল্পনা নিয়ে নিউটন-লিবনিজ সহ অনেকেরই ছিল সন্দেহ। একজন শিক্ষার্থীকে আমরা আসলে কীভাবে বোঝাবো – তুমি যত ছোট ভাবতে পার, এটা তার থেকেও ক্ষুদ্র। এই বাক্যবন্ধের বাস্তব অর্থ কী? লিবনিজ তো বলেই দিলেন, এটা অত্যুত্তম কল্পনা, ‘well-founded fiction’। ১৭৩৪ সালে বিশপ বার্কলে (1685–1753) ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের নামে প্রচলিত এইসব ভূতবাজির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। ‘দ্য অ্যানালিস্ট’ বইতে তিনি গণিতবিদদের তুলোধুনো করে ছাড়েন। তাঁর পরিষ্কার কথা, খ্রিষ্টীয় ধর্মমতের ভিত্তি যদি যুক্তি-বিরোধী হয়, যেমন বিজ্ঞান-মোদীরা বলে থাকেন, তাহলে এটা কী? ক্যালকুলাস যদি আধুনিক বিজ্ঞানের গোড়ার কথা হয়, যদি তার ভিত্তি এমন কুয়াসাচ্ছন্ন হয় (অসীম-ক্ষুদ্রের মত উদ্ভট কল্পনা) তাহলে বিজ্ঞানই বা যুক্তিহীন না হইবে কেন? তুমি আমাকে বল কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তো তুমি তো পর্বতের কুয়াসার চাইতেও ঘন রহস্যে আবৃত! বিজ্ঞানের যুক্তি-কাঠামোর প্রতি বার্কলের এই কুঠারাঘাত আরও প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি চালু ছিল। বিজ্ঞান এগিয়েছে, কিন্তু তার দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। এই আক্রমণের প্রত্যুত্তরে বিজ্ঞানীদের হয় কবুল করতে হয় যে না ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আসলে শূন্য। এমন বললে শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগের ব্যাপারগুলো অনির্ণেয় হয়ে যায়। আর যদি বলতে হয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আসলে কখনোই শূন্য নয়, তাহলে অন্যান্য গণনা অর্থহীন হয়ে যায়। এই ডিলেমার সমাধান কী?
    অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে যোসেফ লাগ্রাঞ্জ (1736–1813) এবং পিয়েরে-সাইমন লাপ্লাস (1749–1827) ক্যালকুলাসের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের দারুন সব বিষয়ের গাণিতিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। যেকোনো পরিবর্তন বা পরিবর্তনের হারকে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস নতুন মাত্রায় বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাশিসমূহকে অনুপাতের কায়দায় পরিবর্তনের হার (rate of change) হিসেবে প্রকাশ করে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস এক নতুন হাতিয়ার হিসেবে হাজির করে। কোনো একটি প্রপঞ্চের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনকে হিসাব করে সেগুলোর সমষ্টিকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক বিবর্তন হিসাব করে যোগজীকরণ বা ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস। ক্যালকুলাসের মূল উপপাদ্য বা ফান্ডামেন্টাল থিওরেম বলে যে পরিবর্তনের হারের যে কলনবিদ্যা (ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস) আর অতিক্ষুদ্র পরিবর্তনের ধারাবাহিক সমষ্টিকরণের যে কলন (ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস) তা আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। ফলে গণিতবিদেরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা ইনফিনিটেসিমালকে একটা সাধারণ সংখ্যার মতই বিবেচনা করতে থাকেন। তবুও অনেকেই মনে করতেন এই ইনফিনিটেসিমালের আইডিয়া কড়া গাণিতিক শর্তের ওপর অধিষ্টিত নয়। পুরো আঠারো শতক ধরেই বার্কলের প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব দেবার প্রচেষ্টা জারি ছিল। যেমন বার্নার্ড দ্য ফনটেনেলি (1657–1757) বললেন যে অসীম-ক্ষুদ্র আসলে অসীমের বিপরীত মান বা ইনভার্স। তিনি আরও যুক্তি দিলেন যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের মত সংখ্যাদের অস্তিত্ব বাস্তব হোক না-হোক, তাদের যৌক্তিক সংহতিই বড় বাস্তবতা। যদি যুক্তির কষ্টিপাথরে টিকে যায় তো ভাল কথা, এরা বাস্তব।
১৮২১ সালে ফরাসী গণিতবিদ অগুস্ত্যাঁ কশি (1789–1857) ‘লিমিট’ নামীয় একটি গাণিতিক ধারণা প্রবর্তন করলেন। এই ধারণানুযায়ী তাৎক্ষণিক গতিবেগকে দুটো অতিক্ষুদ্র রাশির অনুপাত হিসেবে না দেখিয়ে সাধারণ কয়েকটি সসীম অনুপাতের ধারার লিমিট-মান হিসেবে ভাবা হল। এই ধারার রাশিগুলির সমষ্টিগত মান কখনো ঠিক প্রান্তিক মানটিতে পৌঁছে না ঠিকই, কিন্তু খুব কাছে চলে আসে। এত কাছে, যেন আমরা কিছু না-ভেবেই বলতে পারি, ইহাই উহা। এই প্রান্তিক মান বা লিমিট-মান বা ‘ইহাই উহা’তেও কেউ কেউ ভূতের গন্ধ পেলেন। আর সেজন্যই ১৮৫৮ সালে কার্ল উইরস্ট্রাস (1815–97) এর একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দিলেন। ১৮৭২ সালে রিচার্ড দেদেকিন্দ দেখালেন যে, নিরবচ্ছিন্ন সংখ্যা-রেখার অন্তরালে রয়েছে মূলদ এবং অমূলদ সংখ্যাদের এক অসীম জগৎ। উনিশ শতকের এই তিন আবিষ্কারের সমন্বিত ফল হল - - অর্থোডক্স বিজ্ঞানের মন্দির-সোপান থেকে ইনফিনিটেসিমালের ভূতের পলায়ন। কশির লিমিটের ধারণার ফলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো ভূতের কল্পনার আর দরকার পড়ে না। এর ফলে ইউক্লিডীয় যুক্তিনিষ্ঠায় ফেরত যাওয়া সম্ভব হল। দার্শনিকদেরও সুবিধে হল। এর ফলে পরিবর্তনের ভূতকেও তাড়ানো গেল। কারণ ‘ঠিক পরের মুহূর্ত’ বলে আর কিছু নাই এবং এক মুহূর্ত থেকে অব্যবহিত পরের মুহূর্তে যাবারও দরকার নাই। অর্থাৎ দুটি ঘটনার মধ্যবর্তী সংযোগের, এমনকিছু যা দুটি পরপর ঘটনার যোগসূত্র ধরে রাখে, আর দরকার থাকল না।
গণিতের উঁচু বেদি থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের ধারণাকে তাড়িয়ে দিলেও গণিতের অন্ত্যজ ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রায়োগিক ক্ষেত্রগুলিতে, পদার্থবিদ আর প্রকৌশলীদের ফলিত দুনিয়ায়, ইনফিনিটেসিমালের ব্যাবহার দিব্যি চালু থাকল। কারণ প্রায়োগিক সমস্যার সমাধানে প্যাঁচানো জ্যামিতিক রিগোরাস যুক্তির চাইতে ইনফিনিটেসিমালের এস্তেমালে চটজলদি সঠিক সমাধানে পৌঁছনো সহজতর। সেখানে একে heuristic বলে দেগে দেওয়া হয়। একটা কথা বলে রাখা ভাল, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে কখনোই ফরমাল লজিকের সাহায্যে ‘ইনকনজিন্সেন্ট’ প্রমাণ করা হয়নি। একে নিয়ে যে এত ভয়  — এ অসম্ভাব্যতা আনবে, অযুক্তি আনবে, হেঁয়ালি আনবে – এর কোনোটাই কিন্তু প্রমাণিত নয়। আব্রাহাম রবিনসন (1918–74) তাঁর ‘নন-স্ট্যান্ডার্ড অ্যানালিসিস’ দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, এসব ভীতির কোনোটাই যুক্তিযুক্ত ছিল না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অস্তিবান থাকলেও গণিতের সৌধের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হত না। এবং রবিনসন দেখিয়েছেন, সাধারণ যেকোনো সংখ্যার মতই – ধনাত্মক বা ঋণাত্মক, মূলদ বা অমূলদ, জটিল আর বাস্তব সংখ্যা – ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রেরও একটি বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। ভৌত জগতেও পরমাণু, কণা, অব-কণা, প্রোটন, কোয়ার্ক, প্ল্যাংকের স্কেলের ধারণা থেকে মনে হয় যেন অসীম-ক্ষুদ্র, infinitely small, আসলেই বাস্তব। অন্তত ভূত নয়!

আরও পড়ুন

×