ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমুদ্রের নিচে রোমান শহর

সমুদ্রের নিচে রোমান শহর
×

মোশারফ হোসেন

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

কালের পরিক্রমায় শক্তিশালী এবং অজেয় রোমান সাম্রাজ্য হারিয়ে গেছে বহু আগে। তবে এ সাম্রাজ্যের স্মৃতিচিহ্নের খোঁজ এখনও পাওয়া যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রাচীন রোমের অভিজাত শ্রেণির লোকেরা একসময় নেপলসের কাছাকাছি পোজুলি উপসাগরে অবস্থিত বাইয়ে রিসোর্টে দিনরাত পার্টি আর উন্মাদনায় মেতে থাকত।

এ রিসোর্টের মোজাইকগুলো তৃতীয় শতাব্দীর এবং ছোট একটি অংশ আবিষ্কৃত হওয়ার পর ধীরে ধীরে বাকি অংশগুলো সমুদ্রের পানি ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহের মাঝখান দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে জায়গাটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন সমুদ্রের নিচে বিশেষ কিছু আছে। ১৯ শতকে বিভিন্ন জায়গায় মাঝেমধ্যে রোমান ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যেত। ১৯২০ সালের দিকে পোজুলিতে ড্রেজিং করার সময় মার্বেলের মূল্যবান ভাস্কর্যের সন্ধান মেলে। এতে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন ইতালির তৎকালীন ফ্যাসিবাদী নেতা বেনিতো মুসোলিনি। তিনি পুরো এলাকা থেকে পানি নিষ্কাশন করে আরও গুপ্তধন উদ্ধারের নির্দেশ দেন।

এরপর ১৯৪০ সালের দিকে ইতালিয়ান পাইলট রেইমন্ডো বাউচার পোর্টাস জুলিয়াস পোতাশ্রয়ের ওপর দিয়ে বিমান চালিয়ে যাওয়ার সময় একটি ভৌতিক শহর দেখতে পান। খুব নিচ দিয়ে যাওয়ার কারণে রেইমন্ডো দেয়াল, মার্বেলের কলাম, রাস্তা এবং বিস্তৃত ফুটপাতের মতো অবয়বের ছবি তুলতে সমর্থ হন।

সেখানে পানি ছিল দেড় মিটার গভীর। আকাশ ও সমুদ্র পরিষ্কার থাকায় রেইমন্ডো পানির ভেতর অনেক কিছুই স্পষ্ট দেখতে পান। তাঁর ছবিগুলো প্রকাশের পর সারাবিশ্বে পোজুলি উপসাগরের এ অঞ্চল বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

এ ঘটনার পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা কয়েক ডজন প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পান। বাইয়ে রিসোর্টকে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মন্টে কার্লোর সঙ্গে তুলনা করেন। ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা রিসোর্টে এসে নির্মল বায়ু, মদ্যপান, ঝিনুক খেতে পছন্দ করতেন। অগাস্টাস, নিরো ও ক্যালিগুলার মতো রোমান সম্রাটের বাইয়েতে নিজস্ব বাড়ি ছিল। জুলিয়াস সিজারের বাড়ির কিছু অংশ কেম্পি ফ্লেগ্রেই প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে।

বাইয়েকে নির্মাণ করা হয় কেম্পি ফ্লেগ্রেই আগ্নেয়গিরির ঢালে। এখানকার মূল আকর্ষণ ছিল স্পা। মানুষের মধ্যে ধারণা ছিল, এ শহরের স্পাতে বসে বিশ্রাম নিলে সব রোগ নিরাময় হয়ে যায়। সম্রাট হ্যাড্রিয়ান এখানেই মারা যান। জীবনের শেষ সময়ে তিনি এখানে এসেছিলেন সব ধরনের রোগ থেকে মুক্তি পেতে। এখানেই সিনেটর গাইউস ক্যালপুরনিয়াস পিসো সম্রাট নিরোকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন।

চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে বাইয়ের অনেকাংশ পানিতে ডুবে যায়। মূলত সক্রিয় আগ্নেয়গিরির কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ অনেক নিচে নেমে যায়। এতে এ অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বাণিজ্যিক কেন্দ্র পোজুলি ৪ থেকে ৬ মিটার পানিতে তলিয়ে যায়।

বাউচারের ছবি প্রকাশের অনেক পরে ১৯৫৯ সালে স্কুবা ডাইভিংয়ের সরঞ্জামে ব্যাপক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রথম খননকাজ চালানো হয়। এ সময় রাস্তা, ভবনসহ পানিতে ডুবে যাওয়া পুরো শহরের মানচিত্র তৈরি করা হয়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খননকাজ শুরু হয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। সে সময় একটি রুমে সম্রাট ক্লডিয়াসের নির্দেশে তৈরি বেশ কিছু মার্বেলের মূর্তি পাওয়া যায়। অন্যান্য আবিষ্কারের মধ্যে ছিল– প্রাচীন গোসলখানা, ফোয়ারা, মাছের পুকুর এবং সিনেটর গনিয়াস ক্যালপুরনিয়াস পিসোর বাড়িতে তাঁর উপাধি খোদাই করা একটি পানির পাইপ।

২০০২ সাল থেকে ৪৩৭ একরের অঞ্চলটি সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা। এর আগে অনেক মূল্যবান ধ্বংসাবশেষ চুরি করে বিদেশে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে পুরো এলাকা তত্ত্বাবধান করা হয়। পর্যটকরা অনুমোদিত গাইডের মাধ্যমে স্কুবা ডাইভিং করে ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে ৭টি ডাইভিং স্পট আছে। সূত্র: গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

×