ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রচ্ছদ

কাশ্মীর, অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে

কাশ্মীর, অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে
×

অরুন্ধতী রায়

উম্মে মুসলিমা

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

জম্মু পৌঁছে যখন আমরা আগে থেকে বুক করা জিপের জন্য চাঁদিফাটা রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম তখন বাম হাতের তালুতে খইনি নিয়ে ডান হাতের বুড়ো আঙুল গোঁফে তা দেওয়ার মতো ঘুরাচ্ছিল এক অবিনয়ী গুঁফো ড্রাইভার। আমরা গাড়ির পেছনে গিয়ে নম্বর দেখে নিশ্চিত হই। ভ্রমণসঙ্গী বাবুল খইনি টেপা ড্রাইভারের বুকে নামাঙ্কিত ফলক দেখে মালপত্র দেখিয়ে দিল। সে গাড়ির দরজা খুলে দিল কিন্তু মালপত্র ওঠাতে সাহায্য করল না। গাড়ি স্টার্ট দিয়েই ‘রাম সিয়া রাম সিয়া রাম জয় জয় রাম’ গান ছেড়ে দিয়ে ইয়ারদের সঙ্গে জম্মুর আঞ্চলিক ভাষায় ফোনে অনর্গল আলাপ জুড়ে দিল। ড্রাইভারের নাম সুরেশ, তার ভাব দেখে বাবুল আমাদের নিজেদের মধ্যে তাকে ডাকতে থাকল সৈয়দ নামে। আমার কোলের প’রে অরুন্ধতী রায়। মানে ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’। ভাবছিলাম ড্রাইভারের কাছ থেকে জম্মু-কাশ্মীর সম্পর্কে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করব, কারণ অরুন্ধতীর এ বইটি মূলত কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে। কিন্তু সৈয়দকে বাগে পাওয়া যাচ্ছিল না।

 ঈদের আগ দিয়ে বাবুল আর ওর বউ সেহেলির কাশ্মীর ভ্রমণের প্রস্তাবে একেবারে লুঙ্গি ড্যান্স দিতে শুরু করলাম। কারণ, আমি তখন ছিলাম মগ্ন ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এ। অরুন্ধতী রায়ের বিখ্যাত উপন্যাস। বিশাল কলেবরের। নায়ক কাশ্মীরের মুসা ইয়েসুই আমাকে নায়িকা তিলোত্তমা বা তিলোর মতোই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমি কাশ্মীর দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠলাম। যে মুসা কাশ্মীরিদের সম্পর্কে বলছে– ‘আমাদের চেয়ে আমাদের কার্ডের গুরুত্ব বেশি এখন। যে পাবে তার জন্য কার্ডই সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। এটা অনেক বেশি মূল্যবান সবচেয়ে সুন্দরভাবে বোনা গালিচার চেয়ে, সবচেয়ে গরম শালের চেয়ে কিংবা সবচেয়ে বড় বাগানের চেয়ে কিংবা আমাদের উপত্যকার সমস্ত বাগানের সমস্ত চেরি আর সমস্ত আখরোটের চেয়ে।’ জম্মু থেকে যত কাশ্মীরের দিকে এগোচ্ছিলাম তত ঠান্ডা তাড়া করে আসছিল। সন্ধ্যায় পহেলগাম পৌঁছতেই কাশ্মীর পশমিনার জোব্বা পরা অপূর্ব সুন্দর পুরুষদের ঘরে ফেরার সারি চোখে পড়ল। হাঁটাচলায় বিনয়ী কিন্তু চোখেমুখে দৃঢ়তা। হাতে কোনো ব্যানার নেই তবুও তারা যেন বলছে– ‘জিস কাশ্মীর কা খুন সে সিঁচা! ও কাশ্মীর হামারা হ্যায়’– যে কাশ্মীরে আমরা রক্ত দিয়ে সেচ দিয়েছি, সে কাশ্মীর আমাদের। আমি অরুন্ধতী থেকে এত বিড়বিড় করে আওড়ালাম নিশ্চয় তা হাতে লাল সুতো বাঁধা সুরেশ ড্রাইভারের কানে পৌঁছেনি। আগে থেকে বুক করে রাখা কটেজের সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই ড্রাইভার দরজার লক খুলে দিল। মাঙ্কি টুপি পরে নিয়ে গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের প্যান্টের পাছায় বাম হাতের তালু ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে নিচ্ছিল। যথারীতি খইনি নেওয়ার প্রস্তুতি। পায়ের ধার ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছিল বরফ গলা হ্রদ। এমন সুমধুর তার চলার ধ্বনি মনে হচ্ছিল অনাদিকাল থেকে এক নর্তকীর অশেষ পথের যাত্রা। কাশ্মীরে একটানা বিদ্যুৎ এখনও দুর্লভ। বাড়িওয়ালা যুবক মুজাফফর টর্চ হাতে এগিয়ে এসে আমাদের মালপত্র একাই বহন করে কটেজে নিয়ে গেল। আলো চলে এলে বাবুলের পেছনে দাঁড়ানো মুজাফফরকে দেখলাম ‘কাঁধের ওপর দিয়ে মানুষটা ঝলমলে এক হাসি ছুড়ে দিল ... তার পান্নাসবুজ মায়াবী চোখ দুটো ঝিকমিক করছিল’– অরুন্ধতী কাশ্মীরিদের এভাবেই দেখেছিলেন। আমি দেখলাম মুজাফফরের পান্নাসবুজ চোখে এক ধরনের হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা। দূরে কোথাও দুটো গুলির শব্দ পরপর আওয়াজ তুলে থেমে গেল। কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না মুজাফফরের চোয়ালে। সে ড্রাইভারকে পেটপুরে খাইয়ে রাত্রিযাপনের জন্য অনুরোধ করলে সুরেশ তার ইয়ারের সাথে রাত কাটাবে বলে গর্বের সাথে তার বিশাল পশ্চাদ্‌দেশ হাঁকিয়ে চলে গেল। ‘খুব ঠান্ডা ছিল সেই সকালটা, কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো হ্রদ জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল এবং পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল আরও বরফ পড়বে। গাছগুলো নগ্ন। নানা বর্ণের ছাপযুক্ত ডালপালা আকাশের দিকে এমনভাবে তুলে রেখেছিল যেন বিলাপকারীরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শোকের ভঙ্গিতে।’ সকালে মুজাফফর চা দিতে এলে আমি বই খুলে ওই লাইনগুলোর সাথে প্রকৃতির আশ্চর্য মিল খুঁজে পেলাম। অদূরে বরফের টুপি পরা পাহাড়ের চূড়া আর মুজাফফরের ছুঁচালো শাদা টুপির চূড়ায় ভারি সাদৃশ্য। কেবল পাহাড়চূড়া খাড়া স্থির আর মুজাফফরের শাদা মিনার বিনয়ে একটু ঝুঁকে থাকা। আমরা ভোরের কাশ্মীর দেখব বলে হ্রদের ধার ঘেঁষে হাঁটছিলাম। হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল ডোবালাম জলে। আর কয়েক সেকেন্ড রাখলেই জমে যেত আরকি। কুয়াশা ঘোঁট পাকাচ্ছিল পাহাড়ের শাদা চূড়ায়। মনে হচ্ছিল পেছনে বসে কয়লার চুলায় কেউ চা বানাচ্ছে তার ধোঁয়া। আরও দূরের লম্বা সারি দেওয়া বরফের পাহাড়গুলো যেন ফয়েল পেপারে মোড়া কফিন। ফিরছিলাম গেস্ট হাউসে। সাইকেলের ক্যারিয়ারে বিশাল এক বস্তা নিয়ে পশমিনার কুর্তি পরা বাদামি চোখের কাশ্মীরি কৃষক আমাদের তার চাষ করা আখরোট দেখাল। দাম জম্মুর শপিং মলগুলোর অর্ধেক। বলল ‘টেস্ট ফ্রি ম্যাডাম’। আমি অরুন্ধতীর কথামতো এক কেজি সরেস আখরোট কিনলাম। সঙ্গীরা আরও বেশি। সৈয়দ সুরেশ যতই সাম্প্রদায়িক গোঁয়ার হোক, গাড়ি সে দারুণ চালাচ্ছিল। এবার শুনতে পেল বাবুল বলছে আমরা শ্রীনগরে মায়া শর্মার গেস্ট হাউসে উঠব। তাতেই সৈয়দ খুশিতে বাগবাগ। রাম সিয়া রাম জয় জয় রামের ভলিউম বাড়িয়ে দিল। আমি দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর শেষের দিকের অধ্যায় ‘পরমসুখ মন্ত্রণালয়’-এ পৌঁছে গেছি। শ্রীরাম বড্ড গুলিয়ে দিচ্ছিল। বই কোলে খোলা রেখে জানালার কাচ দিয়ে বাইরেটা দেখে নিচ্ছিলাম। অরুন্ধতী আমার দেখার চোখকে মিলিয়ে দিল– ‘তখন ছিল শরৎকাল। হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার মতো সুন্দর হয়ে উঠেছিল বন, একমাত্র হিমালয়ের বনই এমন হতে পারে। চিনার গাছে রং লাগতে শুরু করেছে। তৃণভূমি তামাটে স্বর্ণাভ। আপনার কপাল যদি ভালো থাকে তবে দেখতে পাবেন একটা কালো ভালুক অথবা একটা লিওপার্ড অথবা ডাচিগামের বিখ্যাত হরিণ হাঙ্গুল।’ সুরেশ একখানে গাড়ির গতি ধীর করে দিল। মনে তার আনন্দ বলে সে দয়া করে আমাদের হাঙ্গুল হরিণ দেখার সুযোগ করে দিল। তার এহেন প্রকৃতিপ্রেম এ কয়দিনে আমরা দেখিনি। বলল– ‘জব আপ হাঙ্গুল দেখাতে হ্যায় তো আপকা ভাগ্যা খুল জাতা হ্যায়।’ বাবুল বরিশালের ভাষায় খিস্তি করল– ‘ব্যাডা! তোর হোগা দেইখাই আমগো ইস্কুরু টাইট।’ মায়া শর্মা তার কটেজে আমাদের আমন্ত্রণ জানাল। ডুপ্লেক্স পুরা কটেজটাই আমাদের জন্য। সৈয়দ সুন্দরী মায়ার কপালে ডগডগে সিঁদুর দেখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি উপহার দিল। স্বজাত ভেবে মায়া নিশ্চয় ওই কটেজের নিচতলাতে তার থাকার ব্যবস্থা করবে। বিনিময়ে মায়া বলল– ‘তুমি তোমার নিজের ব্যবস্থা নিজে করো।’ গাড়ি থেকে আমাদের লাগেজ নামানোর জন্য এই প্রথম সে হাত লাগিয়েছিল। দুর্মুখ মায়ার কারণে হাত গুটিয়ে বসে থাকল। পরদিন সারাদিন বোটে দাল লেক ঘুরব আমরা। রাতে বইটা শেষ করতে গিয়েও করলাম না। মুসা আমাকে পুরো আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। লেকের পাড়ে গিয়ে পেলাম বজরাগুলো। কোথায় এইচবি শাহীন? তিলোত্তমা মাঝিকে জিজ্ঞাসা করেছিল এইচবি মানে কী? মাঝি বলেছিল হাউস বোট। সেহেলি জিজ্ঞাসা করাতে আমি ফটাফট বলে দিলাম। মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলাম এইচবি শাহীন বলে কোনো বোট আছে? বলল– ও নামে নেই। থাকলে বেশ হতো। আমি তিলোত্তমার স্পর্শ পেতাম। যে বজরায় করে তিলোত্তমা মুসার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। আমরা ভাড়া করলাম এইচবি লেক ভিউ। যতক্ষণ পাশে শহর বয়ে যাচ্ছিল ততক্ষণ দালের পানিতে শ্যাওলা, পানকৌড়ি, কচুরিপানা। শহর ছাড়িয়ে যেতেই স্ফটিকস্বচ্ছ পানির নিচে দেখতে লাগলাম ঝকঝকে রঙিন নুড়ি, অনাবিল ঢেউতোলা নবীন ঘাসের দোল খাওয়া। আমি পানি স্পর্শ করলাম। মুসা না জানি কতবার দালজলে নেয়ে গেছে! লেকের মধ্যেই খানিক পরপর বেঁধে রাখা বড় বড় বজরায় কাশ্মীরি হস্তশিল্পের মেলা। আমরা একটাতে আমাদের এইচবি লেক ভিউ ভিড়িয়ে উঠে পড়লাম। কাশ্মীরি শাল, কার্পেট, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, পানপাত্র, নকশিকাটা তৈজসপত্র, টুপি, ওড়নায় যেন দাল লেকের পানির ঘ্রাণ লেগে আছে। আমার সঙ্গীরা দামদরে ব্যস্ত আমার চোখ আটকে গেল দালের ঝিরিঝিরি কাঁপন তোলা কিশোরীর ত্বকের মতো মসৃণ পানির দিকে মুখ করে কে একজন দোলকেদারায় বসে আছে। বইটা সাথে আনিনি। কিন্তু আমি তাকে দেখে অনুচ্চারিত কণ্ঠে পড়ে গেলাম ‘মুসা দেখতে ছিল অতিশয় আকর্ষণীয়, অসংখ্য কাশ্মীরি যুবা যেমন হয়ে থাকে সেইরকম। যদিও সে লম্বা ছিল না, তার কাঁধ ছিল চওড়া, আর তার শক্তপোক্ত গড়নের মধ্যে ছিল অপ্রকট বলিষ্ঠতা। তার চুল ছিল ঘন কালো, যা সে খুব ছোট করে ছেঁটে রাখত। তার চোখের রং ছিল গাঢ় বাদামি সবুজ। সামনের একটা ভাঙা দাঁত (যার কারণে হাসলে তাকে হাস্যকরভাবে বাচ্চাদের মতো দেখাত, যদিও হাসত সে কদাচিৎ)।’ সাথিরা কেনাকাটা শেষে আমাকে মৃদু ধাক্কা দিল। মুসা ইয়েসুই মুখ বুজে নিঃশব্দে হাসল। আমি পেছন ফিরে তাকে দেখতে দেখতে আমাদের এইচবি লেক ভিউতে পা ফেলতেই পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিলাম। সফেদ চুলের বুড়ো দোকানদার স্নেহের হাসি হেসে হাত নেড়ে যখন বিদায় দিচ্ছিল তখন দেখলাম বুড়োর সামনের একটা দাঁত ভাঙা। কী বাচ্চাসুলভ হাসি! (বি. দ্র. প্রমিত হোসেন অনূদিত অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ পড়তে পড়তে কাশ্মীর ভ্রমণ শেষ করেছিলাম)। 

আরও পড়ুন

×