যুদ্ধফেরত এক সৈনিকের গল্প
‘দ্য ম্যান আউটসাইড’ নাটকের দৃশ্য
আসিফ রহমান সৈকত
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৫২
নাট্যদল অ্যাক্টোম্যানিয়ার দ্বিতীয় প্রযোজনা, উলফগ্যাং বোরচার্ড-এর নাটক ‘দ্য ম্যান আউটসাইড’। শিল্পকলায় গত ৯ আগস্ট নাটকটি দেখার সুযোগ হয়েছিল। এটি অনুবাদ করেছেন মামুন হক এবং নির্দেশনায় তালহা জুবায়ের। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঁদ হয়ে থাকার মতো একটা নাটক, ব্রেখটের মোহভঙ্গের কৌশলও আছে এতে। নানারকম আবেগ অনুভূতিতে আক্রান্ত করে প্রযোজনাটি। যুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্যক্তি মানুষের দ্বন্দ্ব, যুদ্ধফেরত সৈনিকের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার দ্বন্দ্ব, প্রেম-ভালোবাসা আর কাছের মানুষকে হারানোর বেদনার গল্প। আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানির গল্প।
যে জার্মানি বিধ্বস্ত, যে জার্মানি তাদের পরাজিত সৈন্যদের জন্য যেন একটা কবর বা তারচেয়ে বেশি কিছু। তারা যেন এক একটা জ্যান্ত লাশ। এ রকম একজন সৈনিক বেকম্যান (সাযেম সেজান) যে স্টালিনগ্রাদ থেকে ফিরে আসে নিজের দেশ জার্মানিতে, সঙ্গে শত শত সৈন্যের মরে যাওয়া–নিখোঁজ হওয়ার স্মৃতি, গত তিন বছর যে নিজের দেশের হয়ে বিদেশের মাটিতে তীব্র শীতে যুদ্ধ করেছিল; যাদের হয়ে সে যুদ্ধ করেছিল, যে জার্মানির জন্য, সেই দেশের মানুষগুলো কি ব্যাপারটাকে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতার চোখে দেখে, সেই দেশ তাঁকে আবার সহজে কি জায়গা করে দিয়েছিল? তার একটা ধাক্কা আমরাও পাই যখন নির্দেশক বলে যে, ‘আমি কি তোমাকে যুদ্ধে যেতে বলেছি?’, জার্মানরা কি এসব যুদ্ধফেরত সৈন্যকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিল? যে নদীতে সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল সেই নদীও তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। যে জেনারেলের কথায় সে যুদ্ধে যায় সে জেনারেলের দিন তো কাটে স্ত্রী-ছেলে নিয়ে টেবিল ভর্তি খাবারের বিলাসে; কিন্তু বেকম্যানরা জানে যে, তারা আসলে কত শত সৈন্যের লাশের ওপর দিয়ে গেছে। জেনারেলের এক সৈন্যের মাথা যেন তাদের সিদ্ধান্তের বলি হিসেবে ডাইনিং টেবিলে জায়গা করে নেয়। সিম্বলিজমের জায়গায় দারুণ জরুরি একটা সংযোজন। জেনারেলের পরিবার এবং বেকম্যানের কথোপকথন আমার কাছে পুরো নাটকের সব থেকে শক্তিশালী দৃশ্য। শুধু এই দৃশ্য থাকলেও এটি একটি আলাদা শক্তিশালী নাটিকা হতে পারে। যদি অ্যাক্টোম্যানিয়া অল্প সময়ও পায় কোথায় তাদের কাজ দেখানোর এই একটি দৃশ্য দিয়েই তারা পৌঁছে দিতে পারবেন তাদের কমিটমেন্ট, পরিশ্রম, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠার বার্তা।
জেনারেল (কামরুজ্জামান তাপু), ফ্র ক্রামের (নওরীন সাজ্জাদ), ডিরেক্টর (ফকির বিপ্লব), মারিয়া (মার্শিয়া শাওন), অন্য ব্যক্তি (সাগর বড়ুয়া), জেনারেল ওয়াইফ (প্রথমা রহমান), জেনারেল পুত্র (মার্টিন সাহা)সহ পারিশা মেহজাবীনের কোরিওগ্রাফিতে কোরাসে (সানবি, বাপ্পি, নাবাত, মারজুক, রাসেল) দলীয় অভিনয়ের সেরা একটি নাটক। এ রকম একটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি টেক্সট, যা বিশ্বসাহিত্যেও আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিকে বাংলাতে মঞ্চে আনার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আবহ সংগীত বা মিউজিক যেগুলো ছিল তা দৃশ্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বেকম্যানের চরিত্রে যিনি ছিলেন তিনি প্রথম থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত যেভাবে দর্শককে ধরে রেখেছিলেন তা অসাধারণ। এই নাটক বেকম্যানের কথা বলে কিন্তু বাকিদের অভিনয়ের শক্তি বেকম্যানকে আরও দৃষ্টিগোচর, বোধগম্য করে তোলে। নাটকটির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ তো ব্যাকমেনই।
এর মধ্যে যে অন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের জায়গাটি শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন সেটিই প্রমাণ করে তাদের কমিটমেন্ট এবং দক্ষতা। নামহীন চরিত্রের যে ভয়েস (কণ্ঠ) ছিল, একটি ফিসফিস করা কিন্তু জোরে বলা ডায়ালগ, সেটি একটি মাত্রা যোগ করেছে, সেই দিকে দর্শককে শুনতে বাধ্য করেছে। যেভাবে বলার দরকার ছিল ঠিক সেইভাবে। নাটকের কোরাস গানটি সুন্দরভাবে স্থাপন করা হয়েছে। গৌতম চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন আমাদের কাছে। আমার প্রিয় মহিনের ঘোড়াগুলি। আরেকবার একটি ডায়ালগে আমরা পাই ‘রিকশা, ভ্যানে পড়ে আছে লাশ’ বা এ রকম কিছু, যা সমসাময়িক ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে করার একটি প্রয়াস। এই জায়গাগুলো আরও লেয়ারযুক্ত করেছে, ডিটেইলের অনুভূতি দিয়েছে পুরো কাজটিতে। অনেক সময় পুরো কাজের মধ্যে এই ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু চিন্তার জায়গায় গভীর ব্যাপারগুলো নাটকের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জাগায়। সেজন্য তরুণ নির্দেশক তালহা জুবায়েরের প্রতি থাকল অশেষ ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। প্রায় শেষের দিকে বেকম্যান আমাদের দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, আপনি সেটি মঞ্চের অংশ ধরতে পারেন আবার সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথন হিসেবেও নিতে পারেন।
তখন অন্য শিল্পীরা মঞ্চ থেকে নেমে অনেকক’টি আয়তাকার আয়না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাদের দেখায়, যেখানে আমরা আসলে আমাদেরই দেখতে পাই। আসলে দারুণ টেকনিক এবং অ্যাক্টোম্যানিয়া সেটির একটা সফল প্রয়োগ করে দেখাল, এই চিন্তাটির জন্য নির্দেশককে আরও একবার ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হবে সবার। মঞ্চকে পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন তারা। বারবার এই নাটক মঞ্চায়িত হওয়া দরকার। এটি জরুরি নাটক। যুদ্ধ আক্রান্ত পৃথিবীর জন্য একেবারে সময়োচিত প্রযোজনা।
- বিষয় :
- নাট্যদল
