দ্বৈত ভূমিকার বোঝা ও অদেখা সংগ্রাম: নারী দিবসে মা-ডাক্তারের ডায়েরি থেকে
ফাইল ছবি
ডা: রোজান্না বিনতে কামাল
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ২০:৪১
প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা নারীজয়ের গল্প করি। ক্যারিয়ারে সফলতা, সংসারে দক্ষতা, সন্তানকে গড়ে তোলা- সবকিছুতেই যেন নারী এখন একক নক্ষত্র। কিন্তু এই নক্ষত্রের আলোর আড়ালে যে অন্ধকার সংগ্রাম লুকানো, তা কি আমরা দেখতে পাই? নিজের জীবনের আয়নায় আজ আমি সেই অদেখা সংগ্রামের কথাই বলতে চাই।
আমি একজন চিকিৎসক। সকালে হাসপাতালের পথে বের হব, আর আমার ৫ বছরের ছোট্ট সোনামণি জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। তার কান্নাভরা চোখের ভাষা, ‘মা, যেও না। হাসপাতালে না। আমার সঙ্গে থাকো।’ ওর হাত ছাড়িয়ে, কান্না উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসতে আমার নিজের বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে। কিন্তু যেতে হয়। এটা আমার কর্তব্য, আমার অঙ্গীকার।
আমি যখন রোগী দেখি, প্রেসক্রিপশন লিখি, তখন আমার মাথায় ঘুরপাক খায়, ‘ছেলেটা ঠিকমতো খেয়েছে তো? ওর কাঁদতে কাঁদতে কি ঘুমিয়ে পড়েছে?’ এই অপরাধবোধ, এই মানসিক দ্বন্দ্ব প্রতিদিনের সঙ্গী।
অন্যদিকে, আমার বাড়ির ঠিক পাশের ফ্ল্যাটের গৃহিণী বৌটির কথাই ধরা যাক। তিনি বাড়িতে থাকেন, কিন্তু তার অবস্থাও কি আমার চেয়ে অনেক কম কঠিন? সারাদিন রান্না, সংসারের কাজ, আর ছোট্ট শিশুটিকে কোলে পিঠে নিয়েই তাকে সব করতে হয়। রান্নার ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে, শিশুকে কোলে নিয়ে বাজার করা, সংসারের হাজার কাজের চাপে ছেলেটির সঙ্গে গল্প করা, খেলাধুলা করা, তাকে সময় দেওয়া— সবটাই যেন অসম্ভব হয়ে ওঠে। তিনিও তো চান তার ছেলেকে কোলে নিয়ে গল্প শোনাতে, ইস্কুলের পড়া নিয়ে বসতে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধে তার সেই ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়ার সুযোগটুকুই নেই।
এই হচ্ছে আমাদের সমাজের দুই মুখ। একজন ‘কর্মজীবী মা’ আর একজন ‘গৃহিণী মা’। একজন বাইরের কাজের চাপে সন্তান থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন, আরেকজন ঘরের কাজের চাপে সন্তানের কাছে থেকে থেকেও মন থেকে দূরে সরে যান। দুজনেই মা, দুজনেই নারী। দুজনেরই সংগ্রাম, দুজনেই তাঁর সন্তানের কাছে নিজেকে ‘ঋণী’ ভাবেন।
চিকিৎসক হয়েও যখন আমি অনুভব করি আমার সন্তানের প্রতি ‘অবহেলা’র অপরাধবোধ, তখন একজন সাধারণ গৃহিণীর অনুভূতিটা কী হয়? সমাজ তাকে ‘ভাগ্যবতী’ বলে, কারণ তাকে বাইরে যেতে হয় না, তিনি কি সত্যিই সুখী? তার ‘নিজের সময়’ বলে কিছু থাকে কি?
২০২৬ সালের এই নারী দিবসে আমাদের শপথ নিতে হবে, নারীকে শুধু প্রশংসা করেই থেমে না থেকে, বরং বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাকে শুধু ‘সফল’ বা ‘গৃহিণী’— এই দুটি লেবেলে না ভাগ করে, একজন ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে হবে। একজন মা হিসেবে তার যে মানসিক চাপ, তা কমাতে পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বামীকে শুধু সাহায্যকারী নয়, বরং সহ-অভিভাবক হতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য শিশুযত্নের ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, একজন নারী নিজের প্রতি যে অপরাধবোধ চাপিয়ে দেন, তা দূর করতে তাকে মানসিকভাবে শক্ত করতে হবে এবং বলতে হবে- ‘তুমি যা করছ, তাই যথেষ্ট। তুমি একজন সুপারউম্যান।’
আমার ছেলে আমাকে ‘যেতে বাধা’ দেয়, কারণ সে জানে আমি ফিরে আসব। পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটি তার মাকে ‘ধরে রাখে’ না, কারণ তার মা সারাক্ষণই তার চোখের সামনে থাকেন, কিন্তু তবু দূরে। এই দুই মায়ের কান্না, এই দুই সন্তানের চাহিদা- ২০২৬ সালের নারী দিবসের প্রার্থনা, এই দুঃখ দুটো যেন কমে আসে। নারীর ‘দ্বৈত ভূমিকা’ যেন আর বোঝা না হয়ে, সুন্দর এক সুর হয়ে ধ্বনিত হয় সবার হৃদয়ে। তবেই না আসবে প্রকৃত নারীমুক্তি, প্রকৃত মানবমুক্তি।
বাংলাদেশে ৭০% নারী কোনো নিয়মিত স্বাস্থ্য চেকআপ করেন না, কারণ পরিবার, চাকরি আর ঘরের কাজে তারা নিজেকে ভুলে যান। কর্মজীবী মায়েরা দৈনিক ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন, কিন্তু নিজের খাবার-দাবার বা বিশ্রামের জন্য মাত্র ৩০ মিনিট পান। ফলে স্ট্রেস, ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস এবং হার্টের সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। আমরা অন্যদের জীবন বাঁচাই, কিন্তু নিজের জীবনকে উপেক্ষা করি কেন?
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই চক্র ভাঙার প্রতিশ্রুতি নেওয়ার সময়। আমরা নিজেদের প্রতি বলব: সঠিক খাদ্য নেব, নিয়মিত ব্যায়াম করব, চিকিৎসা করব এবং সহকর্মী নারীদের যত্ন নেব। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি, ফল-সবজি খাওয়া এবং বার্ষিক হেলথ চেকআপকে অগ্রাধিকার দিন। কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের জন্য ‘স্ব-যত্ন ক্লাব’ গড়ে তুলুন- যেখানে তারা অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে।
পুরুষ সহকর্মী, স্বামী এবং পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা উৎসাহ দিন, ঘরের কাজে হাত বাড়ান এবং বলুন, ‘তুমি বিশ্রাম নাও, আমরা সামলে নেব।’
লেখক: ডা: রোজান্না বিনতে কামাল, সহকারী অধ্যাপক, কিডনি রোগ বিভাগ, চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
