ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়

তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়
×

লিওনেল মেসি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৪ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৯

কত শত বিনিদ্র রাত, কত চায়ের কাপে ঝড়, কত সুখ-দুঃখের অলকানন্দা বয়ে গেছে ওই একটা মানুষের পায়ের জাদুতে। যে খেলাঘর তিনি পরম মমতায় গড়েছিলেন পুরো একটা প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে, গতকাল সেই খেলাঘরটাই তিনি নিজ হাতে ভেঙে দিলেন। জানিয়ে দিলেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে দেখা যাবে না তাঁকে। একটা ভাঙন যেন হৃদযের গভীরটা নাড়িয়ে দিল। যদিও এই ভাঙনের ভেতরেও রয়ে গেল এক অদ্ভুত রাজকীয় মাদকতা। ট্রফি, পরিসংখ্যান বা ব্যালন ডি’অরের শুষ্ক ডেটা দিয়ে আজ থেকে হয়তো পণ্ডিতরা তাঁর ব্যবচ্ছেদ করবেন; কিন্তু ভালোবাসার এক তীব্র মায়াজালে জড়িয়ে যে নিঃশব্দ প্রস্থান তিনি নিলেন, তা তো আসলে এক বিশাল শূন্যতা। 

‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়...’। লুসাইলে বিশ্বকাপ জয়ের সেই অমরত্ব লাভের রাত কিংবা মারাকানার কান্না– সবটাই এখন রূপকথা। যারা ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত ঔদ্ধত্য দেখেছে, তারাও কি কখনও ভাবতেও পেরেছিল শান্ত, লাজুক একটা ছেলে এসে ফুটবল ঈশ্বরের সিংহাসনটা একদিন এভাবে নিজের করে নেবে। মেসি কোনো দিন চিৎকার করে বিপ্লব করেননি, তিনি বিপ্লব বুনেছিলেন তাঁর ওই বাঁ পায়ের জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে। রোসারিও থেকে উঠে আসা সেই লাজুক কিশোরকে ফুটবল দেখেছিল তার চোখের আলোয় চোখের বাহিরে।

বিদায়ের আগে আবেগ মথিত করে তিনি যে তিন পৃষ্ঠার দীর্ঘ চিঠিটি লিখেছেন, তার শেষ লাইনগুলো যেন এক মহাকাব্যের অবসান। মেসি তাঁর চিঠির শেষাংশে লিখেছেন, ‘এবার থামার সময় এসেছে। নতুন প্রজন্মের স্বপ্নালু চোখগুলোকে জায়গা করে দিতে হবে, যারা এই নীল-সাদা জার্সির গৌরবকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে।’ বিদায় বেলায় তিনি নিজেই নিজেকে নামিয়ে এনেছেন সাধারণের কাতারে। চিঠির পাতায় লিখেছেন, ‘আজ থেকে আমি আর মাঠের ১০ নম্বর নই। আজ থেকে আমি গ্যালারির লক্ষ কোটি সমর্থকের একজন, যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করবে প্রিয় আর্জেন্টিনার জন্য।’

অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে এতটা আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ে জায়গা পাননি মেসি। বছর দশেক আগেও বুয়েন্স আয়ার্সের কফিশপগুলোতে একটা নির্মম, বিষাক্ত ফিসফাস ঘুরপাক খেত– ‘ও তো বার্সেলোনার মেসি, ও তো আমাদের নয়!’ স্বদেশের একাংশ তখন তাঁকে ছুড়ে দিয়েছিল এক চরম অপবাদ, তিনি নাকি আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামলে জাতীয় সংগীতটাও ঠিকঠাক গাইতে পারেন না! বুকের ভেতর এই চিলতে রক্তক্ষরণ নিয়ে যে মানুষটা দিনের পর দিন বার্সেলোনার হয়ে বিশ্বজয় করেছেন, তিনিই নীল-সাদা জার্সিতে মেটলাইফের সেই অভিশপ্ত ঝড়ের রাতে কোপার ট্রফি হারিয়ে ড্রেসিংরুমে বসে অভিমানে, যন্ত্রণায় ‘বিদায়’ বলে দিয়েছিলেন। 

কিন্তু মহাকাব্যের চিত্রনাট্য তো ঈশ্বর নিজের হাতে লেখেন। বার্সেলোনার সেই চেনা স্বর্গোদ্যান যখন একদিন আচমকা চূর্ণ হয়ে গেল, ঘরছাড়া মেসি একটু একটু করে আশ্রয় খুঁজতে লাগলেন নিজের শিকড়ে। আর তখনই যেন আর্জেন্টাইনদের মোহভঙ্গ হলো। যে জাদুকরকে তারা ভিনদেশি ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন, সেই ঘরের ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় রাস্তায় সেদিন প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা– ‘লিও, আমাদের ক্ষমা করো, ফিরে এসো’। 

অপমান আর আক্ষেপের সেই মরুভূমি পেরিয়ে এক রিক্ত রাজপুত্রকে তাঁর দেশের মানুষই সেদিন আপন করে, রাজকীয় আদরে ফিরিয়ে এনেছিল। সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটাই তো পরে মারাকানা আর লুসাইলের অলৌকিক রূপকথা হয়ে ধরা দিল। কোনো ট্র্যাজেডি কিংবা অপূর্ণতার হাহাকার নিয়ে নয়, বরং সব বৈশ্বিক যুদ্ধ জয় করে এক পরম শান্ত, রাজকীয় প্রস্থান নিলেন তিনি। 

ম্যারাডোনা বিদায় নিয়েছিলেন এক ঝোড়ো অপূর্ণতা বুকে চেপে, কিন্তু লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ ছাড়লেন এক পরম তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে, যেখানে আর কোনো পাওয়ার বাকি রইল না। রাজপুত্র ফিরে গেলেন তাঁর আপন ঘরে। কানের কাছে যেন বারবার বাজছে রবীন্দ্রসংগীতের সেই অমোঘ সুর–‘যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা প’ড়ে যায় নবপ্রেমজালে, তবু মনে রেখো...’।

আরও পড়ুন

×