রাগবেলুন
ছবি এঁকেছেন সাফায়েত সাগর
গল্প লিখেছেন জনি হোসেন কাব্য
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
খেলনার বাক্সটা লাথি মেরে উল্টে দিল আয়ান। তার প্রচণ্ড রাগ উঠেছে। সে লেগো ব্লকগুলো দিয়ে বানাচ্ছিল একটা রকেট। কিন্তু রকেটের একদম মাথার নীল ব্লকটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। রাগে মুখটা লাল টমেটোর মতো হয়ে গেলো। আর ঠিক তখনই ঘটলো সেই আজব কাণ্ডটি! গতকাল মেলা থেকে একটি অদ্ভুত লাল বেলুন কিনেছিল আয়ান। বেলুনওয়ালা লোকটা আয়ানের ডান হাতের কবজিতে সুতো দিয়ে সেটি বেঁধে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘এটা জাদুর বেলুন। তোমার রাগ যতো বাড়বে, এটা ততো ফুলবে।’ আয়ান হেসে কথাটি উড়িয়ে দিয়েছিল তখন।
বেলুনটি এতোক্ষণ একদম চুপসানো ছিল। কিন্তু আয়ান রেগে যেতেই ফুসসস করে সেটি ফুলে এক্কেবারে টেনিস বলের মতো হয়ে গেলো। আয়ান তো অবাক! বেলুনওয়ালা কি তবে কোনো জাদুকর ছিল?
মা ছুটে এসে বললেন, ‘আয়ান, রাগ করে না বাবা। রকেটের ব্লকটা আমি খুঁজে দিচ্ছি। তুমি খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখো।’ আয়ান তো শুনবেই না। সে দাঁত কিড়মিড় করে বললো, ‘না, গোছাবো না। আমি রকেটই বানাবো না।’
বিকেলে আয়ান তার নতুন ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে তৈরি। বন্ধু রাতুলের সাথে মাঠে আজ দারুণ এক ক্রিকেট ম্যাচ হবে। ঠিক এমন সময় আকাশ কালো করে নামলো ঝুমবৃষ্টি। বাবা বললেন, ‘আজ তো বাইরে কাদা, খেলতে যাওয়া যাবে না আয়ান।’
আয়ানের রাগ এবার দ্বিগুণ। তার নতুন ব্যাট, আর আজকেই বৃষ্টি হতে হবে?
‘যাবো! আমি এখনই যাবো। বৃষ্টিতেই খেলবো!’ ‘ফুসসস! ফুসসস!’ বেলুনটা এবার ফুলে হয়ে গেলো একদম তরমুজের মতো। বেলুনের ভেতর কেমন যেন একটা শক্তি, সেটা আয়ানকে ওপরের দিকে টানছে। আয়ান ভাবলো, বেলুনটা তো খুবই অদ্ভুত!
রাতের বেলা। আয়ান স্কুলের ম্যাগাজিনের জন্য অনেক কষ্ট করে একটা ডাইনোসরের ছবি এঁকেছে। রং করার জন্য সে তার সবচেয়ে প্রিয় লাল রঙের পেন্সিলটা খুঁজছিল। একটু পর দেখলো, ছোট বোন রাইসা সেই লাল পেন্সিলটা দিয়ে ডাইনোসরের পেটে হিজিবিজি দাগ কেটে বসে আছে! শুধু তাই নয়, চাপ লেগে মট করে ভেঙে গেলো পেন্সিলের শিসটাও।
ব্যস! আয়ানের রাগ এবার উঠলো চরমে। এতো কষ্টের ছবিটা নষ্ট? সে চিৎকার করে উঠলো, ‘আমার পেন্সিল ভাঙলি কেন? তুই ছবিটা পচা করে দিলি!’
সাথে সাথে ভুসসস করে লাল বেলুনটা ফুলে বিশাল হাতির মতো বড় হয়ে গেলো। বেলুনের হেঁচকা টানে আয়ানের পা শূন্যে উঠে গেলো।
‘আরে! আরে! এ কী হচ্ছে!’ খোলা দরজা দিয়ে বেলুন আয়ানকে নিয়ে উড়ে চলে গেলো আকাশে। নিচে তাদের বাড়িটি ছোট হতে হতে বিন্দু হয়ে গেলো। আয়ানের বড্ড ভয় করছে। এভাবে শূন্যে উড়তে থাকলে তো সে তার প্রিয় মানুষদের হারিয়ে ফেলবে। তখন কে তাকে আদর করবে? কে মজা করে গল্প শোনাবে? হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল এক মেঘ-বুড়ি। ফোকলা দাঁতে হেসে বললো, ‘কী গো দাদুভাই, রাগের বেলুনে চড়ে কোথায় চললে?’
আয়ান কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, ‘আমি তো নামতে পারছি না। আমাকে বাঁচাও। আমার খুব ভয় করছে।’
বুড়ি মুচকি হেসে বললো, ‘রাগের বেলুন তো আর এমনি এমনি কমে না। একটা মন্ত্র আছে। শিখবে?’
‘কী মন্ত্র? এক্ষুনি বলো।’
মেঘ-বুড়ি বললেন, ‘পেট ভরে অনেকখানি বাতাস টেনে নাও দেখি। তারপর এক, দুই, তিন গুনে আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে ফুউউ করে ছাড়ো।’ আয়ান চোখ বন্ধ করে বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিল। তারপর আস্তে করে ছাড়লো, ফুউউউ। ওমনি সুতুতুতুতু শব্দ করে লাল বেলুনটার বাতাস কমতে লাগলো। আয়ান আবার লম্বা শ্বাস নিল, আবার ছাড়লো। বেলুনটা ছোট হতে হতে হয়ে গেলো একদম মার্বেলের মতো। আয়ানও ধীরে ধীরে ভাসতে ভাসতে নেমে এলো।
পরদিন সকালে ছোট বোন রাইসা খেলনা গাড়ি নিয়ে টানাটানি শুরু করলো। কিন্তু সে রাগে ফুঁসলো না। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিল, তারপর ফুউউ করে ছেড়ে দিয়ে মুচকি হাসলো। রাইসাকে আদর করে খেলনাটা
দিয়ে দিল। কারণ সে এখন খুব ভালো করেই জানে, রাগের লাল বেলুনকে কীভাবে চুপসে দিতে হয়!
- বিষয় :
- গল্প