আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
করোনার টিকা কি ক্যানসারের বিরুদ্ধেও কার্যকর
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে করোনার এমআরএনএ টিকা ক্যানসারের টিউমার শনাক্ত করতে সক্ষম। প্রতীকী ছবি/এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:০০ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৩৯
করোনাকালে গণহারে তৈরি এমআরএনএ টিকাগুলো ক্যানসারের টিউমার শনাক্ত করতে সক্ষম। একই সঙ্গে এই টিকা টিউমার নির্মূলেও সহায়তা করতে পারে। সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকরা ইঁদুরের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। এতে দেখা গেছে, ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর আগে যারা করোনার টিকা নিয়েছেন তারা না নেওয়া রোগীদের তুলনায় বেশি সময় বেঁচে ছিলেন। সম্প্রতি জার্মানির বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ও টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমডি এন্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের একদল গবেষক। এর ফলাফল নিয়ে ২৩ অক্টোবর একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে নেচার সাময়িকীতে।
গবেষকেরা জানান, করোনার টিকা শুধু সংক্রমণ প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেমকে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্দীপিত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি এমআরএনএ গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। এমন সময়েই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হলো।
তাই প্রশ্ন উঠছে কেন এই আবিষ্কারকে যুগান্তকারী বলা হচ্ছে? ক্যানসারের রোগীদের জন্য এই গবেষণা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আর করোনা মহামারি কীভাবে এমন এক অপ্রত্যাশিত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পথ তৈরি করল?
এমআরএনএ টিকা কী?
প্রচলিত টিকা সাধারণত ভাইরাসের দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় অংশ ব্যবহার করে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে। কিন্তু এমআরএনএ ভ্যাকসিন ভিন্নভাবে কাজ করে। এতে ভাইরাসের একটি ছোট জেনেটিক কোড (মেসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ) সরাসরি দেহের কোষে প্রবেশ করানো হয়। এতে কোষগুলো ভাইরাসের মতোই একটি ‘স্পাইক প্রোটিন’ তৈরি করে। এর মাধ্যমে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সতর্ক সংকেত পেয়ে প্রতিরক্ষা ঢাল গড়ে তোলে। এরপর দেহে অ্যান্টিবডি ও মেমোরি সেল তৈরি হয়। ফলে, পরে কখনো একইরকম স্পাইক প্রোটিন তৈরি হলে সেটিকে দ্রুত আক্রমণ করতে পারে।
এমআরএনএ ও ক্যানসারের সম্পর্ক আবিষ্কার হলো যেভাবে
গবেষণাটি বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এলিয়াস সায়ুর।

সায়ুরের সাবেক ছাত্র ও অনকোলজিস্ট অ্যাডাম গ্রিপিন। তিনি ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়া ১ হাজারেরও বেশি রোগীর ক্লিনিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি ধারা দেখতে পান। যেসব রোগী ইমিউনোথেরাপি শুরু করার ১০০ দিনের মধ্যে করোনার টিকা নিয়েছিলেন, তারা টিকা না নেওয়া রোগীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সময় বেঁচে ছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব রোগী করোনার টিকা নিয়েছিলেন তাদের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে- ২০.৬ মাস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৩ মাস। যেসব রোগীর টিউমারকে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত ‘ইমিউনোলজিকালি কোল্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে। ক্যানসার চিকিৎসায় যখন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হতে পারে না সেই পরিস্থিতিকে ইমিউনোলজিকালি কোল্ড বলা হয়। গবেষকেরা বলছেন, করোনার টিকা এই শীতল টিউমারগুলোকে উষ্ণ করে তুলেছে। এর ফলে দেহের ইমিউন সিস্টেম সেগুলোকে সহজে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারে।
গবেষকেরা আরও জানান, ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টিকা ও ডোজ নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রেও গবেষণার ফলাফল একই রকম দেখা গেছে।
মেটাস্ট্যাটিক মেলানোমায় (ত্বকের এক ধরনের ক্যানসার) আক্রান্ত রোগীদের তথ্যও গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, যারা টিকা নেননি তাদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল প্রায় দুই বছরের একটু বেশি। বিপরীতে, যারা চিকিৎসা শুরুর আগে টিকা নিয়েছিলেন তারা তিন বছরেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন।
কীভাবে কাজ করে?
গবেষকেরা দেখেছেন, করোনার টিকা দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করে। টিকা দেওয়ার পর এটি দেহের ইমিউন সিস্টেমকে সতর্ক করে। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসারের এমন কোষও শনাক্ত করতে শুরু করে যেগুলো আগে উপেক্ষিত ছিল। একবার ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হলে, তা ক্যানসারের কোষগুলোকে আক্রমণ করে।
তবে ক্যানসারের কোষও পাল্টা প্রতিরোধ বা ঢাল গড়ে তোলে। তারা ‘পিডি-এল১’ নামের প্রোটিন তৈরি করে। যা ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু কিছু ওষুধ আছে যেগুলো এই ঢাল ভেঙে দিতে পারে।
অনকোলজিস্ট অ্যাডাম গ্রিপিন বলেন, যখন ভ্যাকসিন ও এই ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয় তখন ক্যানসার কোষের প্রতিরক্ষা প্রায় অকার্যকর হয়ে যায়।
গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, এই প্রক্রিয়ার সঠিক কার্যপ্রণালি এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। তবে তাদের গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, করোনার টিকা ক্যানসারের বিরুদ্ধে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর ক্ষমতা রাখে।
ক্যানসার রোগীদের জন্য গুরুত্ব
গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে এর প্রয়োগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলে ক্যানসার চিকিৎসায় বড় বিপ্লব ঘটতে পারে।
অনকোলজিস্ট অ্যাডাম গ্রিপিন বলেন, এই টিকাগুলো শক্তিশালী অ্যান্টি-টিউমার ইমিউন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। যা ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
অধ্যাপক এলিয়াস সায়ুর বলেন, এই গবেষণার বেশ ভালো সম্ভাবনা আছে। এটি ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। গবেষণাটি সফল হলে এ ধরনের টিকা ক্যানসার রোগীর সর্বজনীন ভ্যাকসিন হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাডাম গ্রিপিন জানান, তাদের দল এখন তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করছে। করোনার টিকা ভবিষ্যতে ক্যানসার রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসার অংশ হয়ে উঠতে পারবে কি না- এই ট্রায়ালে সেটি দেখা হচ্ছে।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা কী পেয়েছেন?
ইঁদুরের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় গবেষকেরা দেখেছেন, টিউমারের ভেতরে সরাসরি এমআরএনএ টিকার ইনজেকশন দিলে ডেনড্রিটিক সেল বা শ্বেত রক্তকণিকা আরও সতর্ক হয়। ডেনড্রিটিক সেলগুলো যখন টিউমারের উপস্থিতি শনাক্ত করে, তখন তারা টি-সেল নামের প্রতিরোধক কোষগুলোকে সেখানে নিয়ে যায় এবং টিউমারকে আক্রমণ করে।
কিছু ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়া ক্যানসারের বৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। তবে এখানে একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে। সবার শরীরে স্বাভাবিকভাবে ক্যানসার কোষ ধ্বংসকারী এমন টি-সেল থাকে না। অনেকের ইমিউন সিস্টেম টিউমারকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলেও নির্দিষ্ট টি-সেলগুলো বুঝে উঠতে পারে না কীভাবে সেটি ধ্বংস করতে হয়। এ কারণে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি বা ক্যানসার মোকাবিলায় দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার পদ্ধতি ক্ষেত্রে তেমন ফল দেয় না।
