শিশু হাসপাতালের গবেষণা
হামে মৃত ৮২% শিশু প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ পায়নি
হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পরিপূর্ণভাবে বুকের দুধ পায়নি। একই সঙ্গে টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ৯৭ শতাংশ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু ছিল পুষ্টিহীনতার শিকার। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ৩৫৪ শিশুর ওপর এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
গতকাল বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ‘হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি’বিষয়ক কর্মশালা ও গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি চলতি বছর মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম
এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক।
নতুন কোনো ধরনের ভাইরাস নয়
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের পেছনে নতুন কোনো ধরনের ভাইরাসের ভূমিকা নেই। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত অত্যন্ত সংক্রামক ‘বি৩’ ধরনের হামই এবার ছড়িয়েছে। এর সঙ্গে টিকাদানে ঘাটতি, মাতৃদুগ্ধ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অপুষ্টি শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে ৯ মাস বয়সের আগে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সও তখন হয়নি। ফলে ছয় থেকে ৯ মাস বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামের ঝুঁকিতে বেশি পড়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি অপুষ্টির শিকার।
বুকের দুধে বড় ঘাটতি
গবেষণায় অংশ নেওয়া হামে আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পরিপূর্ণভাবে বুকের দুধ পায়নি। তবে মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি, ৮২ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, মায়ের বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে প্রথম ছয় মাস পরিপূর্ণ বুকের দুধ না পাওয়ায় শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। টিকা নেওয়ার বয়স ও অবস্থার ভিত্তিতে গবেষণায় ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করা হয়।
৯ মাসের কম বয়সী এবং নিয়মিত হাম টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি এমন ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে।
এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের (৯২ শতাংশ) এবং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের (৭৬ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়েছে।
তবে দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৭৬ শতাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্যকে টিকা নেওয়া সব শিশুর সংক্রমণের হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। কারণ গবেষণায় অংশ নেওয়া সব শিশুই সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ফলে এ হার শুধু ওই হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ২১ শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও ১৬ শিশুর হাম শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা। টিকার পর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ এর পেছনে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের কোনটি সংক্রমণে ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণ করা এ গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল না।
নিয়ন্ত্রণে আরও দুই-তিন মাস
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, অবাস্তব আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ানো গেলেও হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং মাঠ পর্যায়ে নজরদারির মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমানোর চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর দিয়ে নয়, সঠিক সময়ে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমেই হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচিতে সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং নীতিগত গাফিলতির কারণে যে অনাক্রম্যতার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই ফল এখন দেখা যাচ্ছে। হাজার ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ শয্যা বাড়িয়েও হামে মৃত্যুর ঢল থামানো যাবে না। প্রতিরোধ ও টিকাদানই এর মূল সমাধান।
- বিষয় :
- হাম