‘শিশুশ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের পেছনে স্বার্থ রয়েছে'
সিপিডির মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মোস্তাফিজুর রহমান
সিপিডি আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিং
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ১৮:১৩ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ১৮:২৪
শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে সামনে এনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তার ভাষ্য, শিশুশ্রম নিরসনে সহায়তার বদলে রপ্তানিতে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর উদ্যোগ মানবিক উদ্বেগের চেয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতাকেই বেশি সামনে আনে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সিপিডি দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকট, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ফোর্সড লেবার ও শিশুশ্রমের বিষয়টি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করছে এবং বাংলাদেশের বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশের ইটভাটাসহ বিভিন্ন খাতে শিশুশ্রম রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই বাস্তবতাকে সামনে এনে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ কতটা যৌক্তিক, সেটিই মূল প্রশ্ন।
তার ভাষায়, “যদি এমন হতো যে, বাংলাদেশে শিশুশ্রম রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেটি নিরসনে সহায়তা তহবিল গঠন করেছে বা কোনো সহযোগিতা কর্মসূচি নিয়েছে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হতো। কিন্তু তা না করে যখন রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি সত্যিই শিশুশ্রমিকদের কল্যাণের জন্য, নাকি এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে?”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল, তা দেশটির আদালত বাতিল করে দিয়েছে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতাবলে ১৫০ দিনের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যার মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। তার মতে, ফোর্সড লেবার ইস্যুকে সামনে এনে সেই অতিরিক্ত শুল্ক বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে। সুতরাং এখানে অবশ্যই রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বিষয় রয়েছে, বলেন তিনি।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি নতুন চুক্তির আওতায় আরও ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ফলে মোট শুল্কের হার দাঁড়াবে ৩৪ শতাংশ। এর সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হয়, তাহলে মোট শুল্ক ৪৪ শতাংশে পৌঁছাবে।
তিনি বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেনি, তাদের ক্ষেত্রে কিন্তু এই ১৯ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য নয়। পাল্টা শুল্ক ৬০টি দেশের ওপর আরোপ করা হলেও মাত্র ৯টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি মনে করেন, ইতোমধ্যে সম্পাদিত চুক্তির বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন এবং নতুন করে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক নিয়েও আলোচনায় বসা উচিত। তার মতে, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে ফোর্সড লেবার সমস্যার সমাধান হবে না; বরং অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে এ ধরনের শ্রমের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট আড়াল হচ্ছে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমলেও সেটিকে প্রকৃত উন্নতির প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো পদক্ষেপের কারণে প্রকৃত সংকট আড়াল হয়েছে।
ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এ হ্রাসকে প্রকৃত সম্পদমানের উন্নতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ১৭টি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এটি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের অমিলের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য সিপিডি কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি
রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শেষ প্রান্তিকে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি জানান, জুলাই-এপ্রিল সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত
মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, জ্বালানি, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মার্চ থেকে জুনের মধ্যে এলপিজির দাম ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাহমিদা খাতুন জানান, মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও তা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে
সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে কিছু মূল্যসমন্বয় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিম্নমুখী এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে এ চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখত।
- বিষয় :
- সিপিডি
- শিশুশ্রম
- রপ্তানি
- যুক্তরাষ্ট্র
- শুল্ক আরোপ
