ছাড়া পেয়েও বাড়ি ফিরতে পারছেন না কয়েদিরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২০ | ০১:৩৪ | আপডেট: ১১ মে ২০২০ | ০১:৩৮
গত ৩১ মার্চ পশ্চিম ভারতের একটি কারাগার থেকে ছাড়া পান আরিফ (ছদ্মনাম) নামের এক কয়েদি। এরপর তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পরের রাত পর্যন্ত বাড়িতে তো ঢুকতে পারেনইনি, চেষ্টা করে দুই শহরে পরিচিত কারও কাছে থাকতে পারেননি। বারবার তাকে বাঁধা দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গৃহহীনদের একটা আশ্রয় কেন্দ্রে তার ঠাঁই হয়। সেখান থেকে পালিয়ে তিনি আবারও নিজের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে ঢুকতে না পেরে এখন এক বন্ধুর বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে আছেন।
শুধু আরিফের সঙ্গেই নয়, ভারতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর তার মতো ছাড়া পাওয়া অনেক কয়েদির সঙ্গেই এমনটা ঘটছে। একদিকে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কলঙ্ক, অন্যদিকে বাড়িতে ফিরতে না পারার কারণে অনেকে ছাড়া পেয়েও ট্রমার মধ্যে আছেন।
ট্যাক্সি ড্রাইভার ৩২ বছরের আরিফ মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে বিনা বিচারে ৬ মাস ধরে পশ্চিম মহারাষ্ট্র রাজ্যের তালোজা কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনি জামিনের যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তার পরিবার জামিনের ১৫ হাজার রুপি দিতে না পারায় এতটা সময় তাকে কারাগারেই কাটাতে হয়েছে।
কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভের তথ্য অনুসারে, ভারতে ব্যক্তিগত বন্ড বা বর্ধিত প্যারোলে মুক্তি পাওয়া ২২ হাজার বন্দীর মধ্যে আরিফ একজন।
সংস্থাটি জানায়, আরিফের মতো হাজারো মানুষের গল্পই এখন এমন। তারা আরিফের মতো মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে।
ভারতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যগুলিকে কোভিড -১৯ এর বিস্তার রোধে দেশটির জনাকীর্ণ কারাগার থেকে বন্দীদের মুক্তি দিতে বলেছিল। বর্তমানে দেশটির ১ হাজার ৩৩৯ টি কারাগারে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার বন্দি রয়েছে। এদের মধ্যে শতকরা ৬৯ ভাগ বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। কারাগারগুলি শতকরা ১১৮ ভাগেরও বেশি পূর্ণ। যা করোনার সংক্রমণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিচারকরা বলেছেন, দণ্ডিত বন্দীদের মধ্যে যারা সাত বছর বা তার চেয়ে কম মেয়াদে শাস্তি পেয়েছেন তাদেরকে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও, এখনও যারা বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের মুক্তির জন্যও বিবেচনা করা যেতে পারে।
আরিফ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার দিন কেউ তাকে নিতে আসেনি। কারাগার থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে নীচু পাহাড়ের ধারে মাহাদ শহরে তার বাড়ি। বাবা মারা গেছেন। স্ত্রীও গত বছর অ্যালকোহলে আসক্ত হওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তার প্রতিবন্ধী ভাই, যিনি একটি বেসরকারী ফার্মে চাকরি করেন, লকডাউনের কারণে তার কর্মস্থলে আটকে ছিলেন। এদিকে আরিফের অসুস্থ, বয়স্ক মা ছয় মাস ধরে বাড়ি ভাড়া শোধ করতে পারেন না। প্রতিবেশীরাই তার দেখাশোনা করেন।
এ পরিস্থিতে ক্ষূধার্ত এবং অর্থশূন্য অবস্থায় ছাড়া পেয়ে আরিফ হেঁটে, সাপ্লাই ভ্যানের সহায়তায় বাড়ি ফিরেন। কিন্তু সেখানে যাবার পর প্রতিবেশীরা তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি।
তাদের বক্তব্য, আরিফ মুম্বাই থেকে এসেছে। এ কারণে তারা তাকে ঢুকতে দেবেন না। কারণ ওই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৫০০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৫০০ জনের।
এরপর আরিফ মোবাইল ফোন এবং মায়ের কাছ থেকে ৪০০ টাকা ধার নিয়ে যে সাপ্লাই ভ্যানর এসেছিলেন সেই চালককে ২০০ টাকা দিয়ে মুম্বাইয়ে ফিরে আসেন। সেখানে তার এক সহকর্মী তাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর আশেপাশের কেউ একজন পুলিশকে খবর দেয়। স্থানীয়রা তাকে আবারও আটক করে। এরপর একদল সমাজকর্মী আরিফকে মুম্বাইয়ের রাস্তায় খুঁজে পান।
এপ্রিলের গোড়ার দিকে আরিফকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় । এরপর তাকে শহরের উপকণ্ঠে গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়। তিনি সেখানে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ছিলেন। এরপর আরিফ আবারও সেখান থেকে পালিয়ে বাড়িতে যেতে চান। কিন্তু এবারও বিতাড়িত হন।
আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পালানোর আগে একজন সমাজকর্মীকে আরিফ বলেছিলেন, ‘ সবাই বাড়ি যাচ্ছে। আমিও বাড়ি যেতে চাই। আমাকে কিছু টাকা দিন। আমার মা আমাকে ডাকছেন।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীরা আবারও তাকে তাড়িয়ে দেন।
সমাজকর্মীরা জানান, গত সপ্তাহে আরিফ মাতাল অবস্থায় মাকে দেখতে একটি রিকশা নিয়েছিলেন। কিন্তু ঢোকার আগেই রিকশাচালকের সাথে তার বাকবিতণ্ডা হয় এবং রিকশার ক্ষতি করেন। এখন মালিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তার পরিবার ৪ হাজার রুপি জোগারের চেষ্টা করছেন। সমাজকর্মীরা জানান, আরিফ বর্তমানে তার বন্ধুর বাসায় কোয়ারেন্টাইনে আছেন। সেই সঙ্গে অ্যালকোহল সেবন করছেন।
একদিকে দেশটির শীর্ষ আদালত কারাগারগুলি থেকে কয়েদি কমাতে চাচ্ছে, অন্যদিকে লকডাউন অমান্য এবং অন্যান্য অভিযোগে মানুষজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা প্রয়াসের প্রকল্প পরিচালক বিজয় রাগবন জানান, বন্দীদের মুক্তি দিয়ে আদালতগুলো মাত্র পাঁচ থেকে দশ ভাগ কম ভিড় কমাতে পেরেছে। কিন্তু কারাগারগুলিতে যে পরিমাণ ভিড় আছে তাতে যেকোন একটি বিপর্যয় ঘটতে পারে। সূত্র: বিবিসি