কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার এই নজিরবিহীন প্রতিবাদের নেপথ্যে
মাসুদ আনোয়ার
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২০ | ০৯:৫৮
যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনা যে এবারই প্রথম, তা নয়। এর আগেও পুলিশি নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন টামির রাইস, মাইকেল ব্রাউন, এরিক গার্নারসহ আরো অনেক কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক। তখনও যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়নি, তা নয়। কিন্তু এবারের প্রতিবাদ ভিন্ন ধরনের। জর্জ ফ্লয়েড হত্যা শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নির্বিশেষে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি শহরে নগরে, শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে হাজার হাজার মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের প্রশাসনকে এবারের মতো গলদ্ঘর্ম হতে দেখা যায়নি এর আগে।
প্রতিবাদ বিক্ষোভে শামিল হয়েছে স্থানীয় সরকার, ক্রীড়াক্ষেত্র এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও দেখা গেছে এবার একটা ফয়সালা চায় তারাও। বিশেষ করে মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল পুলিশ বিভাগকে ঢেলে সাজানোর আহ্বান পর্যন্ত জানিয়েছে। আর ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ বিষয়ক প্রতিবাদগুলোকে শ্বেতাঙ্গ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের অংশগ্রহণে আরো বেশি বর্ণ ও বৈচিত্র্যময় মনে হয়েছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের ওপর প্রশিক্ষণ কোর্সের একজন কর্মী ফ্র্যাঙ্ক লিওন রবার্টস বলেছেন, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে ‘বিদ্রোহের জন্য নিখুঁত ঝড়’ তৈরিতে বিভিন্ন কারণের সমন্বয় ঘটেছে।
জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর দৃশ্যটা ‘খুব ভয়াবহ ও স্পষ্ট'ভাবে ফুটে উঠেছিল সবার সামনে। একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা পুরো ৯ মিনিট ধরে জর্জ ফ্লয়েডের গলার ওপর হাঁটুচাপা দিয়ে রেখেছে। জর্জ ফ্লেয়েড আর্তস্বরে আকুতি জানাচ্ছে, ‘আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে’। তারপর একসময় তা স্তব্ধ হয়ে যায়, ভিডিওতে ধারণ করা এমন দৃশ্য শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গনির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে শিহরিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
রবার্টস বলেন, পুলিশি নির্যাতন অবশ্য আগেও ঘটেছে। তবে তার একটা দ্বিমাত্রিক কারণ ছিল। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা ভিন্ন। দায়ী পুলিশরা বলেচে, তারা নিজেদের ওপর পাল্টা আক্রমণের ভয় করেছিল, তাই তারা এটা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা গেছে জর্জ ফ্লয়েড সম্পূর্ণই নিরস্ত্র ছিলেন। তাছাড়া চারজনের বিরুদ্ধে তার একজনের পক্ষে মারাত্মক কোনো কিছু করাও সম্ভব ছিল না।
ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে অংশ নেয়া মানুষদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন, যারা প্রথমবারের মতো এতে সাড়া দিয়েছেন। জর্জ ফ্লয়েডের নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাদের এটা ভাবতে বাধ্য করেছিল যে, এর পর আর ঘরে বসে থাকা যেতে পারে না। মেরিল্যান্ডের একজন বিক্ষোভকারী সারিনা লেক্রয়ে বলেন, এর আগেও অনেকে মারা গেছেন পুলিশের হাতে। তবে সেগুরোর বিডিও হয়নি বলে মানুষের চোখের সামনে খবরটা এতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয়, ভিডিওতে দৃশ্যমান নৃশংসতা ও ঘৃণা মানুষের ভেতরে আরো তীব্র ঘৃণা জাগিয়ে তুলেছে।
বরাবরই ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সমর্থক ওয়েংফয়ে হো বলেন, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু প্রথমবারের মতো তার রাস্তায় নামার ব্যাপারে একটা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
ঘটনাটা ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন দুনিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশটিতে মহামারি থাবা পেতে বসেছে আর বেকারত্ব ও আর্থিক অনটন মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলতে শুরু করেছে। রবার্টসের মতে, অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা ঘটলে ইতিহাস পাল্টে যেতে শুরু করে। ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে করোনা নামের এক অপ্রত্যাশিত মহামারির সময়ে। কর্মচঞ্চল আমেরিকানরা স্তব্ধ হয়ে ঘরে বসেছিল। ১৯৩০ সালের এক মহামন্দা তাদের গ্রাস করেছিল। আর ঠিক এমনি সময়ে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা তাদের কর্মহীন কিন্তু ক্লান্ত মনের ওপর দারুণ চাপ সৃষ্টি করেছিল। আসলে মহামারিটি আমাদের জীবনধারা ও কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ শতাংশ বেকারত্বের অর্থ হলো মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল হতাশা আর বিক্ষোভ সৃষ্টি করা। অসন্তোষ ধূমাযিত হয়ে উঠছিল। পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডটা ছিল খড়ের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়ার মতো। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অনাস্থার প্রকাশ হয়ে উঠেছিল এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ।
এবিসির এক জরিপে দেখা গেছে ৭৪ শতাংশ আমেরিকান অনুভব করেছেন, ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড তাদের দেশের কৃষ্ণাঙ্গ জনতার ওপর শ্বেতাঙ্গদের আক্রোশের একটা বহিঃপ্রকাশ।
২০১৪ সালে মাইকেল ব্রাউন এবং এরিক গারনারের মৃত্যুর পর একই ধরণের একটি জরিপে ৪৩ শতাংশ আমেরিকান এমন ধারণা পোষণ করেছিলেন। ৬ বছরের ব্যবধানে তা আরো বেড়েছে।
রবার্টস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে মন্তব্য করতে কোনো ধরনের শব্দ ব্যবহারেই ইতস্তত বোধ করে না। সূত্র: বিবিসি
- বিষয় :
- জর্জ ফ্লয়েড