সমকাল এক্সপ্লেইনার
আফগানিস্তানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কী করতে চাইছে তালেবান
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সনাতনী পদ্ধতিতে কাজ চলছে। সাধারণ নাগরিকরাও যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করায় বন্ধের মুখে আফগান নারীদের অনলাইনে পড়াশোনার সুযোগ। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:২১ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৬
‘মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ছাড়া আমরা অন্ধের মতো হয়ে গেছি। এখানে সব ব্যবসা মোবাইল ফোনে হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে, মনে হচ্ছে ছুটি চলছে। সবাই নিজ বাড়িতে বসে আছে।’ কাবুলের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী নাজিবুল্লাহ মঙ্গলবার যখন বার্তা সংস্থা এএফপিকে এসব কথা বলছিলেন, তখন আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছিল।
আফগানিস্তানে আংশিকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ শুরু হয় গতকাল সোমবার। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, দেশটিতে পুরোপুরিভাবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করা হয়েছে। মোবাইল ফোন ও টেলিফোন নেটওয়ার্কও এর আওতায়।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্রোটন ১২০টি দেশের সার্ভার সুবিধা দেয়। এক্স পোস্টে তারা জানিয়েছে, আফগানিস্তানে তাদের সেবা আর কাজ করছে না। কাবুলে দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটও মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। কাবুল থেকে বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। দুবাই বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কাবুল ও দুবাইয়ের মধ্যে ফ্লাইটগুলোতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। স্থানীয় সময় দুপুর পর্যন্ত আটটির মধ্যে ছয়টি ফ্লাইট বাতিল হয়।

আফগান বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টোলো নিউজ এক্স ও ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সনাতনী পদ্ধতিতে কাজ চলছে। সাধারণ নাগরিকরাও যোগাযোগ করতে পারছেন না।
কেন ইন্টারনেট বন্ধ
আফগানিস্তানের ইন্টারনেট মূলত একটি জাতীয় ফাইবার অপটিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। পরিচালনা করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘আফগান টেলিকম’। মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা তাদের কাছে থেকে সংযোগ কেনে।
জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, ‘অনৈতিকতা’ ও ‘অসৎ কর্মকাণ্ড’ বন্ধের জন্য তালেবান সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছে। অসৎ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের নামে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই তারা ফাইবার অপটিক কেবল কেটে দেওয়া শুরু করে।

চলতি মাসের শুরুতে আফগানিস্তানের বালখ প্রদেশে একই কারণে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। তখন প্রাদেশিক সরকারের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, ‘সরকার ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন মেটাতে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করবে।’ একই সময়ে উত্তরাঞ্চলের বাদাখশান ও তাকহার প্রদেশের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার, হেলমান্দ, নানগারহার ও উরুজগানেও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।
বালখ প্রদেশে যখন ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় তখন একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন গভর্নর হাজী জায়েদ। তখন তিনিও ‘অনৈতিকতা’ ও ‘অসৎ কর্মকাণ্ড’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে কোন ধরনের কাজগুলো অসৎ হিসেবে গণ্য হবে তা উল্লেখ করেননি। বলেছিলেন, ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ এসেছে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার কাছে থেকে।
আফগানিস্তানে ‘সৎকর্ম প্রচার ও অসৎ কর্ম প্রতিরোধ আইন’ পাস হয় গত বছরের ২১ আগস্ট। পশতু ও দারি ভাষায় প্রণীত এই আইনের ধারা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে আফগানিস্তান অ্যানালিস্ট নেটওয়ার্ক (এএএন)। সেখানে তালেবান সরকার চিহ্নিত ‘অসৎ কাজের’ ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এএএন বলেছে, আইনে অনেক নিষিদ্ধ ও বাধ্যতামূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। যে কাজগুলো আইন প্রয়োগকারীদের প্রতিরোধ করতে বলা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে, ব্যভিচার, অবৈধ যৌন সম্পর্ক, সমকামিতা, জুয়া খেলা, পশু ও পাখির লড়াই, জীবন্ত প্রাণীর ছবি আঁকা বা তোলা, দাড়ি কামানো, অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা, নওরোজ ও শব-ই-ইয়ালদা (বসন্ত ও শীতকালীন উৎসব) উদযাপন করা। নারীদের পুরো শরীর ও মুখ আবৃত রাখার পাশাপাশি অচেনা পুরুষদের সামনে গান গাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বেশি ভুক্তভোগী কারা
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে মোট জনসংখ্যা চার কোটির বেশি। ডেটা রিপোর্টাল গত মার্চে তাদের প্রতিবেদনে জানায়, এর মধ্যে ২ কোটির বেশি মানুষ সেলুলার মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ১ কোটির বেশি মানুষ ব্যবহার করে স্মার্টফোন। সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত বছরের আগস্টে আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষা নিয়ে একটি বিবৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। তাতে বলা হয়, মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ করায় প্রায় ১৪ লাখ আফগান মেয়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মঙ্গলবার বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, উচ্চশিক্ষায় বিধিনিষেধ থাকায় অনেক তরুণী অনলাইনে পড়াশোনার দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু তালেবান সরকার ফাইবার অপটিক কেবল কেটে দেওয়ার মাধ্যমে অনেকের সে সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধের কারণে দেশটির গণমাধ্যম, বিনোদনের মতো নাগরিক ও মৌলিক অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের পথ বের করেছিলেন। তারা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবেন। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেসরকারি ব্যাংকিং খাত ক্ষতির মুখে পড়বে।
অধিকারকর্মীরা যা বলছেন
আফগানিস্তানের ডিজিটাল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট উসামা খিলজির মতে, নাগরিকদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে বিনোদন ও খবর দেখেন। তারা সরকারের কাজের সমালোচনাও করন। ফলে কট্টর শাসকরা এই পথ বন্ধ করতে চাইছে। তাদের বেশি নজর নারীদের স্বাধীনতায়। তারা মনে করে, ইন্টারেনট নারীদের এক ধরনের স্বাধীনতা দিচ্ছে। এটি থামানোর উপায় হলো ইন্টারনেট বন্ধ করা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারী অধিকার বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ম্যাকারেনা সায়েজ। তিনি বলেন, তালেবানের লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে নারী ও কিশোরীদের সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া। মাধ্যমিক শিক্ষা ও চাকরি থেকে বঞ্চিত করার পর অনেক মেয়ের জন্য ইন্টারনেট নতুন পথ খুলে দিয়েছিল। সেটিও এখন বন্ধ হলো।
এবারই কি প্রথম
নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের তালেবান শাসনামলেও ইন্টারনেট নিষিদ্ধ ছিল। ক্ষমতা হারানোর পর তারা নিয়মিত মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারগুলোতে হামলা চালাত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ যাতে না হয় সেজন্য ক্ষমতায় আসার আগ মুহুর্তেও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল। একই বছর কাবুল দখলের পরও সম্ভাব্য বিক্ষোভ দমনে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে।
নতুন করে ব্ল্যাকআউটের বিষয়ে জানতে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পায়নি।
