ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ, কী ঘটছে

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ, কী ঘটছে
×

বিক্ষোভের সময় পুলিশের ছোঁড়া গুলি দেখাচ্ছেন আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির নেতা শওকত নেওয়াজ মীর। বুধবার মুজাফফরাবাদে। ছবি: এএফপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৩৫ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:০৫

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার চুতর্থদিনের মতো ধর্মঘট পালিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। যদিও বিক্ষোভকারীদের হিসাবে এ সংখ্যা ১৫ জন। যাদের মধ্যে তিনজন পুলিশের কর্মকর্তা। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। 

আজাদ কাশ্মীরে বিক্ষোভ শুরু হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর। ওইদিন থেকে লকডাউন কর্মসূচির ডাক দেয় জম্মু কাশ্মীর যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। এই সংগঠনটি মূলত ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিধিত্ব করে। লকডাউনের কারণে কয়েকটি জেলার কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে (স্থানীয়ভাবে পরিচিত) ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। 

জেএএসি’র নেতারা জানিয়েছেন, ৩৮টি দাবিতে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। 

বিক্ষোভ যেভাবে শুরু হয়
পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের প্রাদেশিক সরকার আধা স্বায়ত্তশাসিত। সেখানে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ও আইনসভা আছে। ২০১৭ সালে জনশুমারি অনুযায়ী, অঞ্চলটির জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। 

আগুন জ্বালিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন কয়েক তরুণ। বুধবার মুজাফফরাবাদে। ছবি: এএফপি

বর্তমান অস্থিরতার প্রথম শুরুটা হয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে। তখন অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে বাসিন্দারা রাস্তায় নামেন। একই সময়ে ময়দা চোরাচালান ও ভর্তুকি দেওয়া গমের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি তৈরির অভিযোগ ওঠে। ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষুব্ধরা ওই বছরের আগস্ট মাসে একত্রিত হয়ে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেপ্টেম্বরে তারা মুজাফফরাবাদে একত্রিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জেএএসি প্রতিষ্ঠা করেন। 

আন্দোলন প্রথম বড় সংঘর্ষে রূপ নেয় ২০২৪ সালের মে মাসে। বিক্ষোভকারীরা মুজাফফরাবাদের দিকে দীর্ঘ মিছিল শুরু করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন (এক পুলিশ সদস্য) নিহত হন। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ময়দার দাম কমানো ও বিদ্যুতের শুল্ক হ্রাসে সম্মত হলে বিক্ষোভ স্থগিত করা হয়। কিন্তু অঞ্চলটিতে শান্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের আগস্টে জেএএসি ঘোষণা দেয়; তারা আরেক দফায় লকডাউন শুরু করবে। অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও তারা এবার আরও কিছু দাবি উত্থাপন করে।

বিক্ষোভকারীদের দাবি কী
সরকারের কাছে এবার ৩৮টি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এরমধ্যে আছে বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প চালু এবং প্রাদেশিক আইনসভার কাঠামো পরিবর্তন করা।

তবে তালিকার শীর্ষে থাকা দাবিটি হলো সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুবিধা বিলোপ করা। বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাপ্ত সুবিধার মধ্যে আছে দুটি সরকারি গাড়ি, ব্যক্তিগত সহকারীসহ দেহরক্ষী এবং সরকারি কাজে ব্যবহৃত যানবাহনে সীমাহীন জ্বালানি। ২০২৪ সালের মে মাসের বিক্ষোভের সময় সরকার এসব সুবিধা পর্যালোচনার জন্য কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। 

এ ছাড়া, আঞ্চলিক আইনসভায় শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের বিলোপ চাওয়া হয়েছে। জেএএসি বলছে, ১৯৪৭ সালের বিভাজনের পর শরণার্থীরা ভারতশাসিত কাশ্মীর থেকে এসেছে। কিন্তু তারা এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্লক গঠন করে উন্নয়ন তহবিলের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। 

৩৮টি দাবি আদায়ে সমাবেশ করেন আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সদস্য ও সমর্থকরা। ছবি: এএফপি

দাবিগুলোর মধ্যে আরও আছে, ২০২৩ ও ২৪ সালের বিক্ষোভের সময় হওয়া মামলা প্রত্যাহার, করমুক্তি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ছাড়া, পাহাড়ি অঞ্চলকে পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত করতে টানেল ও সেতু নির্মাণ করা।

সরকারের প্রতিক্রিয়া কী
বিক্ষোভ দমনে স্থানীয় প্রশাসন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আরোপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে আধাসামরিক বাহিনী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে মোতায়েনের বিষয়টি বিতর্ক তৈরি করেছে। জেএএসি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের বিরোধীতা করছে। 

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার সংঘর্ষে নয়জন নিহতের কথা বললেও স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এ সংখ্যা ১৫ জন। আজাদ কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী আব্দুল মাজিদ খান বলেন, সংকট সমাধানে এরই মধ্যে একটি প্রতিনিধিদল মুজাফফরাবাদে এসেছে। তারা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করবে। গত বছর বিক্ষোভের সময় তোলা দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। কিন্তু এরপরও নতুন করে বিক্ষোভ করার আগে তাদের বোঝা উচিত ছিল- সবকিছু এক রাতে সমাধান হয় না।

মজিদ খান আরও বলেন, সরকার ৩৮ দাবির বেশিরভাগই মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। দুটি বিষয়ের আলোচনায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। সেগুলো হলো- শরণার্থীদের জন্য আইনসভায় আসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি সুবিধা বাতিল।

এরপর কী হবে
গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারি প্রতিনিধি ও জেএএসির সদস্যদের আলোচনায় কোনো সমাধান বের হয়নি। আজ শুক্রবার ফের আলোচনায় বসতে পারে উভয়পক্ষ। তবে সমস্য হলো তাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘটতি তৈরি হয়েছে। 

আব্দুল মাজিদ খান বলেন, ‘আলোচনায় যখন তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি দেখা দেবে, সরকার তখন দ্রুত ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা চালু করবে। মুজাফফরাবাদে আলোচক কমিটি উপস্থিত থাকায়, আমি নিশ্চিত যে এই স্থবিরতার সমাধান বের হবে। পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হতে পারে।’

আরও পড়ুন

×