এশিয়া
ঘূর্ণিঝড়-বন্যায় চার দেশে প্রাণহানি সহস্রাধিক, কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন
ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর আঘাতে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ৩৯৫ জন, নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে । সোমবার কলম্বোর উপকণ্ঠে ভেল্লাম্পিতিয়ায় নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে প্লাবিত এলাকার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন বাসিন্দারা (ছবি- এএফপি)
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৪১
কয়েকটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, প্রবল বর্ষণ, বন্যা ও ভূমিধসের কবলে পড়ে গত ১০ দিনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিন দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রাণহানি ছাড়িয়েছে হাজারের ঘর। নিখোঁজ রয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। গৃহহীনের সংখ্যাও কয়েক লাখ। হঠাৎ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের অবস্থা ভয়াবহ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালয়েশিয়াও।
আলজাজিরার খবর বলছে, আন্দামান সাগর, মালাক্কা প্রণালি এবং বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার ইন্দোনেশিয়া। সেখানে এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক নিহতের খবর মিলেছে, নিখোঁজ প্রায় ৫০০। একই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে থাইল্যান্ডে ১৭৬ জন ও মালয়েশিয়ায় তিনজন নিহতের খবর মিলেছ। এরপর ভারত মহাসাগরের নিম্নচাপ থেকে উদ্ভূত ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর তাণ্ডবে শ্রীলঙ্কায় ৩৩৫ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে, নিখোঁজ প্রায় ৪০০ মানুষ।
ইন্দোনেশিয়া
গত শুক্রবার ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের আঘাতে তছনছ হয়ে গেছে সুমাত্রাসহ আশপাশের দ্বীপাঞ্চল। চার লাখ ৮২ হাজার ২৮৬ দশমিক ৫৫ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৬০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ আছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। বিবিসি জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকার ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে। কিছু গ্রামে এখনও ত্রাণ পৌঁছায়নি। ফলে খাবার ও পানি চুরির অভিযোগ উঠছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সুমাত্রা দ্বীপের ভিডিওতে দেখা গেছে, খাবার, ওষুধ এবং জ্বালানি সংগ্রহের জন্য মানুষ ধসে পড়া ব্যারিকেড, প্লাবিত রাস্তা এবং ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে ছুটছে। কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোতে পৌঁছানোর জন্য কোমর সমান বন্যার পানির মধ্যে হেঁটে যাচ্ছেন। পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা।
থাইল্যান্ড
ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে এ পর্যন্ত ১৭৬ জন নিহতের খবর মিলেছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ। থাইল্যান্ডের দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগের এক মুখপাত্র বলেছেন, বন্যার পানি ইতোমধ্যে নেমে যাওয়া শুরু করেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ পাঠানোর পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সংযোগও ফের চালু হচ্ছে।
মালয়েশিয়া
তুলনামূলকভাবে কম হলেও ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের প্রভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে মালয়েশিয়াও। দেশটিতে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহতের খবর মিলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেরলিস, পেরাক, কেদাহ, সিলানগর, কালাতান, পাহাঙ এলাকা।
শ্রীলঙ্কা
ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহর আঘাতে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে মানুষ এখনও সংগ্রাম করছে। এ পর্যন্ত ৩৯৫ জন নিহত ও প্রায় ৪০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ১১ লাখ মানুষ। বিভিন্ন অঞ্চলে ধ্বংস হয়ে গেছে ২৫ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি। প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়ায় এই বিধ্বংসী বন্যার কারণ আংশিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী লা নিনা চক্র। লা নিনা হলো প্রাকৃতিক জলবায়ুর এমন একটি চক্র, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশ স্বাভাবিকের চেয়ে শীতল এবং পশ্চিমাংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজির জলবায়ু বিজ্ঞানী রক্সি ম্যাথিউ কোল বলেন, এই চক্রটি এশিয়ার ওপরে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত আর্দ্রতা যোগ করে। ফলে প্রায়ই আরও প্রবল বৃষ্টিপাত এবং বন্যার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনটি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে পাল্টে দেয়, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে বৃষ্টি-ভারী ঝড় এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
- বিষয় :
- শ্রীলঙ্কা
- মালয়েশিয়া
- থাইল্যান্ড
- ইন্দোনেশিয়া
- ঘূর্ণিঝড়
- বন্যা
