ফিরে দেখা ২০২৫
পাল্টা শুল্কে টালমাটাল ছিল রপ্তানি খাত
ছবি: সংগৃহীত
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২০:৩৬ | আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২২:৪০
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘটনা ছিল বিদায়ী বছরের রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা। এ বছরের মাঝপথে এসে এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বিশ্বব্যাপী আমদানি-রপ্তানির গতিপ্রবাহ পাল্টে দেয়।
বলা যায়, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে টালমাটাল হয়ে ওঠে রপ্তানি বাণিজ্য। পাল্টা শুল্ক আকারে বাড়তি ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকরের মাস থেকেই রপ্তানিতে ভাটা নামে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য বাজারকেও প্রভাবিত করে এই ভাটার টান। বছরের শেষে এসেও এই প্রবণতা আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
পাল্টা শুল্ক আরোপের আগ পর্যন্ত মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল দেশের রপ্তানি চিত্র। বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি ছিল। পরের মাসে রপ্তানি বাড়ে ৩ শতাংশের মতো। মার্চ মাসে আরও বেড়ে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১১ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে এপ্রিলে ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে রপ্তানির গতি কমে আসে। ওই মাসে রপ্তানি বেশি ছিল ১ শতাংশের মতো।
মে মাসে আবার রপ্তানি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। জুন মাসে আবার ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে রপ্তানি সাড়ে ৭ শতাংশ কম হয়। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা সাধারণত এই দুই ঈদেই ছুটি কাটিয়ে থাকেন। প্রতি ঈদে ৭ থেকে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ থাকে। জুলাই মাসে রপ্তানি বাড়ে বছরের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। কিন্তু এর মধ্যেই নেমে আসে শুল্কের খড়গ। তখন থেকেই হঠাৎ রপ্তানিতে ছন্দ পতন হয়। ব্র্যান্ড ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দেন। চলমান রপ্তানি আদেশও বাতিল কিংবা স্থগিত হয়। রাতারাতি কমে যায় রপ্তানি আয়।
গত ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে ৬০ দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশসহ বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়। এ হার পণ্যভিত্তিক শুল্ক হারের অতিরিক্ত। বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে থাকে, সেসব পণ্যে আগে শুল্ক হার ছিল গড়ে সাড়ে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ তখন মোট শুল্ক ভার দাঁড়ায় ৫২ শতাংশ, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা স্থগিত করা হয়।
তিন মাসের এ শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক হার পুনর্নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। ১ আগস্ট থেকে এই হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় গত ১ আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওইদিন থেকেই কার্যকর হয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে চূড়ান্ত শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।
এই পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার মাস আগস্টে বছরের প্রথম বারের মতো রপ্তানি পতন শুরু হয়। মাসটিতে রপ্তানি কমে যায় ৩ শতাংশ। সেই পতন আর বন্ধ হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি কমে ৫ শতাংশ। অক্টোবর মাসে রপ্তানি আরও বেশি সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কমে। নভেম্বর রপ্তানি কম হয় ৬ শতাংশ। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের রপ্তানি প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে পতনের ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে আসার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।
বাজারপ্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাল্টা শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি যতটা কমেছে, তার চেয়ে বেশি কমেছে অন্য বাজারে। পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রথম মাস আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যায় ৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি প্রায় আগের বছরের একই মাসের সমানই দাঁড়ায়। অক্টোবরে কমে ৫ শতাংশ। নভেম্বরেও প্রায় ৫ শতাংশ কম হয় রপ্তানি।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে প্রধান রপ্তানিকারক দেশ চীন, বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, ভারতসহ সব দেশের পণ্যেই বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের জেরে এই দেশগুলো বিকল্প বাজার হিসেবে ২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এবং অপ্রচলিত শ্রেণির দেশগুলোতে ঝুঁকতে থাকে। স্বাভাবিকের চেয়ে কম দরে পণ্য রপ্তানির কৌশল নেয় চীন। এ কারণে গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে ইইউ জোটে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে গড়ে ১ শতাংশ।
একই পরিস্থিতি অপ্রচলিত বাজারের বেলায়ও দেখা গেছে। মার্কিন পাল্টা শুল্ক কার্যকরের আগের মাস জুলাইয়ে এসব বাজারে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশের বেশি। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর আগস্টে তা ১ শতাংশে নেমে আসে। পরবর্তী তিন মাস টানা রপ্তানি কমছে যথাক্রমে ১৬ শতাংশ, ১২ ও ৫ শতাংশ।
বিদায়ী বছরে রপ্তানি বাণিজ্যে একক দেশ হিসেবে প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক এবং এই শুল্কের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি কমে যাওয়ার বাইরে উল্লেখ করার মতো আর বড় কোনো ঘটনা ছিল না।
