ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা কী কাজ করবে
বিবিসির কোলাজ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৩৭
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর দেশটিতে মজুত থাকা তেল উত্তোলন করে সেটি ব্যবহার করার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতার ‘নিরাপদ’ পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ‘চালাবে’ বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চান, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো সেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করুক, যাতে ওই অব্যবহৃত সম্পদকে কাজে লাগানো যায়।
ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার ‘ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়া’ তেল পরিকাঠামো মেরামত করবে এবং ‘দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে’।
যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ হবে না। এ ক্ষেত্রে তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। সতর্ক করে তারা বলেন, ভেনেজুয়েলার মজুত তেলের উত্তোলন ‘অর্থবহভাবে’ বাড়ানোর জন্য একদিকে যেমন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে, তেমনি এ কাজে দশ বছর পর্যন্তও সময় লেগে যেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে— এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে? ট্রাম্পের পরিকল্পনা কি এক্ষেত্রে ঠিকমতো কাজ করবে?
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের আবাসস্থল ভেনেজুয়েলায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের মতো তেল মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু মজুদের তুলনায় দেশটি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে ‘খুবই কম’ তেল উত্তোলন করতে পারছে।
বিশেষ করে, ২০০০ সালের গোড়ার দিক থেকে সেখানে তেল উত্তোলন ‘তীব্রভাবে’ হ্রাস পেয়েছে। কারণ, দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজের সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পেট্রোলিয়াম অব ভেনেজুয়েলার (পিডাব্লিউভিএসএ) ওপর এ বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। পরে মাদুরো সরকারও একই ধারা অব্যাহত রাখে, যার ফলে বহু অভিজ্ঞ কর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান।
যদিও মার্কিন কোম্পানি শেভরনসহ কিছু পশ্চিমা তেল কোম্পানি এখনও দেশটিতে কাজ করছে। কিন্তু মাদুরো সরকারের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্প্রতি আরও কঠোর করার ফলে বেসরকারি ওইসব কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যহারে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার ওপর প্রথম মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ২০১৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটিতে বিনিয়োগ কমে যায়, যার ফলে তেল উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
‘অবকাঠামোগত সমস্যায় আসলে তাদের বড় চ্যালেঞ্জ,’ বিবিসিকে বলছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টেকের পণ্য বিভাগের প্রধান ক্যালাম ম্যাকফারসন। তেলের বাজার নিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, গত নভেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলা গড়ে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা বিশ্ব বাজারের এক শতাংশেরও কম। অথচ, ১০ বছর আগেও দেশটি এখনকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেল উৎপাদন করতো।
ভেনেজুয়েলার খনিতে মজুত তেলের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, সেগুলো তথাকথিক ‘ভারী এবং টক’, যা পরিশোধন করা বেশ কঠিন। কিন্তু, ডিজেল এবং আস্ফাল্ট (পেট্রোলিয়াম থেকে প্রাপ্ত পিচ জাতীয় অর্ধতরল কালো পদার্থ) তৈরিতে সেগুলো বেশ কার্যকর।
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত পেট্রোল তৈরিতে ব্যবহৃত ‘হালকা ও মিষ্টি’ প্রকৃতির তেল উৎপাদন করে থাকে।
ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে আটকের আগে দেশটির উপকূলে দু’টি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেইসঙ্গে, তেলবাহী অন্য ট্যাংকারগুলোকেও অবরোধের নির্দেশ দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
ডেটা প্ল্যাটফর্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ পণ্য বিশ্লেষক হুমায়ুন ফালাকশাহি বলছিলেন, ভেনেজুয়েলার মজুত তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর সামনে বাধাগুলো প্রধানত ‘আইনি এবং রাজনৈতিক’।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ফালাকশাহি বিবিসিকে বলেন, ভেনেজুয়েলায় তেলকূপ খনন করার জন্য সেদেশের সরকারের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে। এটি মাদুরো পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার এখনকার বাস্তবতায় কোনো কোম্পানি যদি সেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায়, সেটি অনেকটা ‘জুয়া খেলার মতো’ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার হবে।
সেই বিনিয়োগের লাভ-ক্ষতির অনেকটাই নির্ভর করবে দেশটির ভবিষ্যৎ সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার জন্য মাসের পর মাস সময় লাগবে,’ বলেন ফালাকশাহি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যে পরিকল্পনা সেটার সুবিধা পেতে হলে তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামোগতখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটি করার জন্য কোম্পানিগুলোকে আগে ভেনেজুয়েলার নতুন সরকারের সঙ্গে চুক্তি সই করতে হবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভেনেজুয়েলা আগে যে হারে তেল উত্তোলন করতো, সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য কোম্পানিগুলোকে কয়েক বিলিয়ন ডলার করে বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব ঠিকঠাক থাকলে বিনিয়োগের ফল পেতে এক দশকও সময় লেগে যেতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের অন্যতম প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ওপর ‘সীমিত আকারে প্রভাব’ ফেলবে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে পারলে তেলের দাম হয়ত কিছুটা কমবে। তবে সেটার জন্য অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে এবং বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ।
এজন্য এতটাই বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে যে, সেটি ২০২৬ সালে তেলের দামের ওপর খুব প্রভাব ফেলবে না বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ। শিয়ারিং আরও বলছিলেন, ভেনেজুয়েলায় একটি স্থিতিশীল সরকার না আসা পর্যন্ত তেল কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাবে না।
দশকের পর দশক ধরে বিনিয়োগ না হওয়া ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেখানকার তেল উত্তোলন বাড়ানো এখন রীতিমতো ব্যয়বহুল ব্যাপারে পরিণত হয়েছে,’ বলেন শিয়ারিং।
এই অর্থনীতিবিদ এটাও বলছিলেন যে, বিনিয়োগের পর ভেনেজুয়েলা যদি আগের মতো প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন মিলিয়ন ব্যারেলও তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, তবুও সেটি বিশ্বের শীর্ষ দশ উৎপাদকের কাতারে আসতে পারবে না।
পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে তেল উৎপাদনের উচ্চহারের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তাছাড়া বিশ্বে এখন তেলের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও ভেনেজুয়েলায় কাজ করার অনুমতি পায় শেভরন। বস্তুত তারাই বর্তমানে একমাত্র মার্কিন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি, যারা এখনও ভেনেজুয়েলায় সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মোট তেল উত্তোলনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তারাই করে থাকে। কোম্পানিটি বলেছে, তারা তাদের কর্মীদের নিরাপত্তার দিকে মনোনিবেশ করছে এবং ভেনেজুয়েলার ‘সব আইন ও বিধি’ মেনে চলছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনার ব্যাপারে দেশটির অন্য বড় তেল কোম্পানিগুলো এখনও প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ফালাকশাহি বলছিলেন, তেল কোম্পানিটির শীর্ষ কর্তারা হয়তো ভেনেজুয়েলায় কাজের সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়ে ‘অভ্যন্তরীণভাবে’ আলোচনা চালিয়ে যাবেন।
