মার্কিন প্রশাসনে অস্থিরতা
হোয়াইট হাউসে টিকে আছেন ট্রাম্পের তোষামোদকারীরাই
আবদুস সামাদ আজাদ
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:৫০
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে কর্মকর্তাদের রদবদলের তালিকা বেড়েই চলেছে। প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদে কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। মাঝখানে হোয়াইট হাউস স্থিতিশীল হলেও যুদ্ধের মধ্যে প্রশাসনের অস্থিরতা প্রথম মেয়াদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের ভেতরের পরিস্থিতি এখন সতর্কতামূলক। কর্মকর্তারা এখন পদ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা ইমেইলে বার্তা লেখার আগেও অনেক ভেবেচিন্তে লিখছেন। এখনকার বৈঠকগুলো সংক্ষিপ্ত হচ্ছে। এসব বৈঠকে কর্মকর্তারা শব্দচয়নে এখন আরও সতর্ক। নিজের পদ রক্ষাই এখন তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টিকে আছেন কেবল ট্রাম্পের তোষামোদকারীরাই।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, হোয়াইট হাউসে কর্মকর্তারা এমন একটি সময় পার করছেন, সবাই যেন নিজেদের নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছেন। আরেকজন আরও স্পষ্ট করে বলেন, কর্মকর্তারা এখন নিজেদের পালটে ফেলায় ব্যস্ত।
ইরান যুদ্ধের প্রাক্কালে হোয়াইট হাউসে যে রদবদল হচ্ছে তা আগের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। মার্কিন প্রশাসনের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোয়েম ও অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির বরখাস্ত হওয়াটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তাদের পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যপদ্ধতিতে একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব ঘটনাকে প্রশাসনিক পুনর্গঠন হিসেবে চালিয়ে দিলেও হোয়াইট হাউসের ভেতরে বড় অস্বস্তি তৈরি করে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ চলাকালীন প্রশাসনের বড় বড় কর্মকর্তাদের কেন বরখাস্ত করা হলো।
রদবদলে বিঘ্ন ঘটছে প্রশাসনিক ভারসাম্যে
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন, বর্তমানে সেই পরিস্থিতি ফেরানো হচ্ছে। তার প্রথম মেয়াদ অস্বাভাবিক হারে কর্মী পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদ স্থিরভাবে শুরু হলেও সাম্প্রতি পরিস্থিতি আগের মেয়াদকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। কর্মকর্তাদের বরখাস্তের ঘটনায় প্রশাসনিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে।
এভাবে প্রশাসন কতদিন অক্ষত থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বদলে গেছে। প্রশাসন একটি সমন্বয়ের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যে, কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হতে পারে। অবশ্য ট্রামের সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন, প্রেসিডেন্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছেন।
হোয়াইট হাউসে আরও একটি অপসারণ আসন্ন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দ্য গার্ডিয়ান বৃহস্পতিবার লিখেছে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্যক্তিগতভাবে উপদেষ্টাদের কাছে ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ডকে প্রতিস্থাপন করার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
এদিকে সম্প্রতি ট্রাম্পের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন বর্তমানে হোয়াইট হাউসের বর্তমান প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিটও। ট্রাম্প একটি ঘটনায় প্রেস ব্রিফিংয়ে সরাসরি তার নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনি খুব বাজে কাজ করছেন।‘ এই ঘটনার পরে সিএনএন লিখেছিল, পরের মাসটা যদি লিভিট পার করতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে বড় খবর।
কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসমিন ক্রকেট তার এক লেখায় বলেছেন, ‘প্রশাসন অযোগ্য পুরুষদের চেয়ে অযোগ্য নারীদের অনেক দ্রুত বলির পাঁঠা বানাচ্ছে।‘ রিপাবলিকান পার্টির একজন দীর্ঘকালীন কৌশলবিদ অ্যাক্সিওসকে বলেন, যদি শুধু নারীদেরই বরখাস্ত করা হয়, তবে হোয়াইট হাউসের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবেই।‘
ক্রিস্টি নোয়েমকে নিয়ে হতাশ হন ট্রাম্প
লা ভয়েসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ক্রিস্টি নোয়েমের বরখাস্তের ঘটনা ছিল বড় ধরনের অস্থিরতা ইঙ্গিত। এর পেছনের কারণটি ছিল যতটা না পরিস্থিতিগত, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত।
পলিটিকো ও ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, মিনেসোটার গোলাগুলির ঘটনা এবং অভিবাসন দমনের বিষয়ে নোয়েমের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ওই ঘটনায় নোয়েম যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাতে ট্রাম্প প্রশাসন একপ্রকার বিপাকে পড়ে গিয়েছিল।
ফলে পরিস্থিতি হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শুনানির সময় ডেমোক্র্যাট নেতা ও কংগ্রেস সদস্য জেসমিন ক্রকেটের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন নোয়েম। জেসমিন প্রশ্ন তোলেন ক্রিস্টি তার দায়িত্ব সম্পর্কে নিজেই কিছু বোঝেন না। এসব কথা ওঠার পর ক্রিস্ট্রির স্থলে ট্রাম্পের একনিষ্ঠ অনুগত মার্কওয়েন মুলিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগ পম বন্ডির বিরুদ্ধে
পাম বন্ডির বরখাস্তের পেছনেও একই যুক্তি কাজ করেছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট ও অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে জানা, ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, এপস্টাইন সম্পর্কিত নথি পর্যালোচনা এবং তা ঘিরে গণমাধ্যমের বয়ান নিয়ে বন্ডি সরকারি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। বিষয়টি অবশেষে রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছিল।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ট্রাম্প বন্ডিকে ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে অক্ষম’ কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্রুত বিচার করতে ব্যর্থতায়ও বন্ডির ভূমিকা নিয়ে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিলেন ট্রাম্প।
সবচেয়ে সমালোচিত ব্যক্তিরা কেন বরখাস্ত হননি
সাম্প্রতিক বরখাস্তের ঘটনা সত্ত্বেও প্রশাসনের সবচেয়ে সমালোচিত দুই ব্যক্তিত্ব প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র স্বপদে বহাল রয়েছেন। যা একটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার ভুল করলেও তার কিছুই হয়নি। অ্যাক্সিওস ও ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, তাদের টিকে থাকাটা কর্মক্ষমতার চেয়ে কৌশলেরই প্রতিফলন।
গণমাধ্যম মহলে প্রভাব থাকার কারণে হেগসেথ এখনও মূল্যবান। উপদেষ্টারা তাকে রাজনৈতিকভাবে উপকারী বলে বর্ণনা করেছেন। এজন্য তীব্র সমালোচনা থাকলেও তিনি বরখাস্ত হননি। কেনেডির অবস্থান আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো যোগ্যতা না থাকলেও তিনি স্বাস্থ্য নীতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর তত্ত্বাবধান করেন। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পলিটিকোকে বলেন, তিনি ট্রাম্পকে ঠিক সেটাই দেন যা তিনি চান। সমালোচনা হজম করে তিনি ট্রামের নীতি রক্ষায় কাজ করেন। আরেকজন উপদেষ্টা সরাসরি বলেই ফেলেছেন, কেনেডি যোগ্যতা নয়, ট্রাম্পের আনুগত্যের কারণে টিকে আছেন।
সূত্র: টাইম ও লা ভয়েস ডি নিউইয়র্ক
- বিষয় :
- হোয়াইট হাউস
- ট্রাম্প
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট
