ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

যুদ্ধ ও শান্তির দোলাচলে বিপন্ন গাজার জনপদ

যুদ্ধ ও শান্তির দোলাচলে বিপন্ন গাজার জনপদ
×

গাজার মানবিক পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৯

দীর্ঘ কয়েক মাসের কূটনৈতিক তৎপরতা ও নানামুখী আলোচনার পরও গাজা উপত্যকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনও সুদূরপরাহত। একদিকে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের স্থবিরতা রয়েছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব বাড়ছে। সব মিলিয়ে গাজার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার এক গোলকধাঁধায় বন্দি। রোববার ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল কায়রোয় মিসরীয় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে। তবে আলোচনায় কোনো আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। আর ইসরায়েলের অবরোধে ত্রাণ সহায়তার অপ্রতুলতায় গাজায় মানবিক সংকটও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। 

ডয়চে ভেলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় মাস আগে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ নিয়ে যে সমঝোতা হয়েছিল, তার অনেক অমীমাংসিত ইস্যু নিয়েই এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচনা। এখন দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়ের স্থায়ী শান্তি আদৌ সম্ভব কিনা, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলে গণহত্যা শুরুর পর ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু দখলদার দেশটির অব্যাহত হামলায় সেই সমঝোতা বারবার হুমকির মুখে পড়ছে। 

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি) ১০ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ছয় মাস পার হলেও গাজার বেসামরিক মানুষ এখনও হামলা, ত্রাণ সহায়তার অপ্রতুলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকা পড়ে আছে। 

গত জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে গাজার জন্য শান্তি পর্ষদ গঠন করলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব নগণ্য। কোটি কোটি ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর সিকি ভাগও গাজায় পৌঁছায়নি। 

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের পর্যবেক্ষক পিটার লিন্টল বলেন, ‘সবকিছুই এখন বৃত্তাকারে ঘুরছে। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার– এই মূল বিষয়গুলো নিয়ে এখনও কোনো মীমাংসা হয়নি।’ 

একই মত প্রকাশ করেছেন হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন উলফগ্যাং ফুচস। তাঁর মতে, আলোচনার টেবিলে সমঝোতার চেয়ে এখন অবিশ্বাসই বেশি প্রবল হয়ে উঠেছে। 

এদিকে, গাজার মানবিক পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। ইসরায়েলের দুই বছরের নির্বিচার হামলায় প্রায় ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, গাজা সিটির জেইতুনপাড়ায় ইসরায়েলি গুলিতে সালেহ বাদায়উই (৯) নামে এক শিশু নিহত হয়েছে। বেইত লাহিয়া ও খান ইউনুসে পৃথক হামলায় আরও তিন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম আর ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। 

ইরান যুদ্ধের প্রভাব ও অর্থায়ন সংকট 
আবার গাজার পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো অঞ্চলের অস্থিতিশীল সামরিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে ইরানের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো গাজার পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তারা নিজেরাই এখন ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চাপে রয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেল শোধনাগার এবং রপ্তানি টার্মিনালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি চাপে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে গাজার ত্রাণের ওপর। 

পশ্চিম তীরে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথেও কাঁটাতারের বেড়া!
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। ফলে ঝুঁকি নিয়ে বিকল্প পথে স্কুলে যেতে হচ্ছে শিশুদের। মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনাকে একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি স্থল অভিযান শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ বেড়েই চলেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষ আর শিশুদের ওপর। অবরুদ্ধ বাস্তবতায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে বহু ফিলিস্তিনি শিশুর। 

পশ্চিম তীরের উম্ম আল-খাইর গ্রামে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাশের কারমেল বসতি থেকে আসা লোকজনই এই বাধা তৈরি করেছে। গ্রাম পরিষদের প্রধান খলিল হাতালিন জানান, শিশুদের নিরাপদ চলাচলের একমাত্র পথ এটি। সেই পথ বন্ধ হওয়ায় তাদের ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে, যা সরাসরি বসতির কাছ দিয়ে যায়। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনাকে একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, বসতি স্থাপনকারী ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করছে, যা কার্যত জাতিগত নিধনের শামিল।

আরও পড়ুন

×