আহমাদিনেজাদকে ইরানের ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ফাইল ছবি: এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ১৯:৩৯ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ | ১২:২৯
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার কয়েকদিন পর একটি মন্তব্য করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ইরানের ভেতর থেকে কেউ যদি দেশটির দায়িত্ব নেয় তবে সেটি খুবই ভালো হবে।
ট্রাম্প তখন কাকে ইঙ্গিত করেছিলেন তা স্পষ্ট করেননি। তবে যুদ্ধ শুরুর প্রায় আড়াই মাস পর জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিবেচনায় ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। কর্মকর্তারা টাইমসকে বলেছেন, পরিকল্পনাটি তৈরি করেছিল ইসরায়েল।
কর্মকর্তারা আহমাদিনেজাদের বিষয়ে তথ্য দিলেও একটি বড় প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করেননি। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে আহমাদিনেজাদ ঘোর মার্কিনবিরোধী ছিলেন। তিনি ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়েও তিনি বেশ তৎপর ছিলেন। এমন একজন নেতাকে খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেন ক্ষমতায় বসাতে চাইবে?
পরিকল্পনাটি অবাক করা
পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তা ও আহমাদিনেজাদের সহযোগীদের ভাষ্য, যুদ্ধের প্রথম দিনই তেহরানের একটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়। আহমাদিনেজাদ ওই বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলেন। হামলায় তিনি আহত হন। মূলত গৃহবন্দি দশা থেকে মুক্ত করতেই বাড়িটিতে হামলা চালানো হয়। কিন্তু এতে তিনি এতটাই আহত হন যে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সংক্রান্ত পরিকল্পনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
হামলাটির পর সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর বর্তমান অবস্থান বা শারীরিক অবস্থার তথ্যও অজানা। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর এই পরিকল্পনা এতটাই অবাক করার মতো বিষয় যে, শুধু ‘বিস্ময়কর’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ্যণীয় দিক হলো- ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদ বর্তমান শাসকদের অন্যতম সমালোচক হয়ে উঠেছিলেন। এ কারণে কর্তৃপক্ষ তাঁকে কঠোর নজরদারিতে রাখে। এর মধ্যেও তিনি কীভাবে ইসরায়েলি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ও তাতে রাজি হয়েছিলেন সে উত্তর মেলেনি।
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা ও আহমাদিনেজাদের বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল টাইমস। মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে হামলার লক্ষ্য হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, উৎপাদন কেন্দ্র গুড়িয়ে দেওয়া এবং নৌবাহিনীসহ প্রক্সি গোষ্ঠীকে দুর্বলের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল টাইমস। তবে সংস্থাটির একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
‘জেল ভাঙার অভিযান’
যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রায়ই ইরানে একজন ‘বাস্তববাদী’ নেতার সন্ধান নিয়ে কথা বলেছেন। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু মানুষ আছেন যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক।
আহমাদিনেজাদের বিষয়ে তথ্য দেওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা টাইমসকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের বিমান বাহিনী পূর্ব তেহরানের বাড়িটিতে অভিযান চালিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল পাহারার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের হত্যা করা। হামলায় গার্ডরা নিহত হলেও আহমাদিনেজাদের বাড়ির তেমন ক্ষতি হয়নি।
গত মার্চ মাসে ‘দ্য আটলান্টিক’ আহমাদিনেজাদের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তাঁর সহযোগীদের বরাত দিয়ে বলা হয়, হামলার পর সাবেক এই প্রেসিডেন্ট সরকারি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। প্রতিবেদনটিতে ওই ঘটনাকে জেলের তালা ভাঙার অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
আটলান্টিকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক সহযোগী নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, আহমাদিনেজাদ নিজেও ওই হামলাটিকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা মনে করেছিলেন। আমেরিকানদের মনে হয়েছিল, আহমাদিনেজাদ ইরানের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম ও যোগ্য ব্যক্তি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও তাঁর আছে।
সহযোগীটি আরো ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র আহমাদিনেজাদকে ভেনেজুয়েলার ডেলসি রদ্রিগেজের মতো একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। চলতি বছরের শুরুতে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর রদ্রিগেজ কারাকাসের ক্ষমতায় বসেন। এরপর থেকে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।
আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফর
অনেক ইরানির অভিযোগ আহমাদিনেজাদ পশ্চিমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ইসরায়েলের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন। গত কয়েক বছরে তাঁর বিদেশ সফরের ঘটনা এই জল্পনাকে আরো উসকে দেয়।
২০২৩ সালে তিনি মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালা সফর করেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাঙ্গেরিতেও যান। এই দুটি দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। হাঙ্গেরির সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মিত্র হিসেবে পরিচিত।
গত বছরের জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলা শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে হাঙ্গেরি থেকে ইরানে ফেরেন আহমাদিনেজাদ। কিন্তু ইসরায়েল হামলা করলেও তা নিয়ে তিনি খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাননি। যে দেশকে তিনি মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন সে দেশের চালানো হামলার পরও নীরবতার ঘটনা ইরানের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মাঝে বেশ কৌতুহলের জন্ম দিয়েছিল।
ট্রাম্পের প্রশংসা
প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আহমাদিনেজাদ ধীরে ধীরে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার প্রকাশ্য সমালোচকে পরিণত হন। ধারণা করা হয় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে তাঁর এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
২০১৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমাদিনেজাদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ প্রশংসা করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়ে নানা যুক্তি দেন।
আহমাদিনেজাদ বলেছিলেন, ‘ট্রাম্প বেশ কাজের মানুষ। তিনি একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় সহজেই লাভ-ক্ষতির হিসাব ও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁকে বলতে চাই, আসুন আমরা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে দুই জাতির দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির হিসাব করি।’
- বিষয় :
- ক্ষমতা
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইসরায়েল
- নিউইয়র্ক টাইমস
