ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বিশ্লেষণ

কোণঠাসা ইসরায়েল, নিজের শর্তে মধ্যপ্রাচ্য বদলে দিচ্ছে ইরান

কোণঠাসা ইসরায়েল, নিজের শর্তে মধ্যপ্রাচ্য বদলে দিচ্ছে ইরান
×

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

দ্য কনভারসেশন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ১৬:৩০ | আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ | ১৭:১৪

ইসরায়েলে সোমবার ইরান যে পরিসরে হামলা করেছে, সেটির তুলনায় তেল আবিব জবাব দিতে পারেনি। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সংযত থাকতে বলেছেন। অতীতে এমন নজির খুব কম।

এবারের এই ব্যতিক্রম ঘটনার কারণ কী? এর উত্তরে সামনে আসছে চলমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ইরান সম্পূর্ণ নতুন কিছু নিয়মের ওপর ভিত্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে তারা সফলও হতে পারে।

ইরান নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার জবাব দিতে সোমবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেনি। বরং লেবাননে হামলার জবাব দিতে তেল আবিবে আঘাত হেনেছে। নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলার এটি প্রথম লক্ষণ। লেবাননের হয়ে হামলা করে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই অঞ্চলে দেশ দুটি কী করতে পারবে আর কী করতে পারবে না।

ছয় মাস আগেও ইসরায়েল লেবাননে নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারত। কিন্তু এখন ইরান এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে যে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রতিবেশীদের ওপর আগ্রাসন চালাতে গিয়েও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন। 

ইরানের আঞ্চলিক শৃঙ্খলা সাজানোর আরেকটি অংশ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর তেহরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। বরং বিরোধীদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, ‘আমরা যা বলি তাই করো, অন্যথায় বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করে দেব।’ এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টার চেয়ে বরং বাস্তবতা মেনে নেওয়াকে শ্রেয় মনে করছে।

নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলার দ্বিতীয় দিকটি হলো- নিজেদের কর্তৃত্বকে মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য ইরান বহুমুখী কৌশল নিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে, চাইলেই এখন ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি বইয়ে দিতে পারে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে, মার্কিন সেনাদের হত্যা করতে পারে এমনকি বিশ্ব অর্থনীতিকেও চাপে ফেলতে পারে। এতকিছু করার পরও তাদের শাসনব্যবস্থা বদলের বাস্তব কোনো ঝুঁকি এখনো সামনে আসেনি।

দীর্ঘমেয়াদি ‘গেমের’ জন্য ইরানের পকেটে এখনো অনেক ‘কার্ড’ রয়ে গেছে। সোমবার ইসরায়েলে হামলার সময় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও যোগ দিয়েছিল। এর মাধ্যমে ইরান দেখাল, তারা চাইলে লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি সরবরাহও বন্ধ করে দিতে পারে। উল্লেখ্য, হুতিরা ইতোমধ্যেই লোহিত সাগরে ইসরায়েলি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে বহুবার ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা, খার্গ দ্বীপ দখল কিংবা হরমুজ প্রণালিতে সামরিক পাহারা স্থাপনের হুমকি দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারাত্মক পরিণতির শঙ্কায় সবকটি সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে গেছে।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর টানাপোড়েন
নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলার তৃতীয় দিকটি হলো- ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একই সুরে তাল মিলিয়ে চলছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্টো বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখছেন। সমর্থন প্রত্যাহারেরও হুমকি দিচ্ছেন। ছয় মাস আগে এ ধরনের পরিস্থিতি কল্পনা করাটাও অসম্ভব ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন করা তেহরানের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন। দুই দেশের সম্পর্কে বিচ্ছেদ হয়েছে তা এখনই বলা যাবে না। তবে এ কথা সত্য যে, মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর সক্ষমতা অনেকখানি সংকুচিত হয়ে পড়বে। 

প্রশ্ন হলো ইসরায়েলকে রক্ষার জন্য ওয়াশিংটন আর কতদিন তাদের দামি অস্ত্র নষ্ট করবে? স্বল্প মেয়াদে হয়তো আরও কিছুদিন তারা এটি করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রাখাটা কোনো টেকসই উপায় হবে না।

নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার চতুর্থ ও শেষ বৈশিষ্ট্যটি হলো- নেতানিয়াহুর কোণঠাসা দশা। রাজনৈতিক চাপে তিনি একদিকে লেবাননে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে পারবেন না, অন্যদিকে ইরানের হামলার বিপরীতে চুপ থাকাটাও তাঁর জন্য কঠিন। কিন্তু যতদিন তিনি লেবাননে আগ্রাসন চালাবেন ততদিন ট্রাম্পের পক্ষ থেকে চাপ তৈরি হবে। কারণ, যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট দ্রুত একটি চুক্তি করতে চাইছেন। বিপরীতে তেহরানের পক্ষ থেকে আগে লেবাননে আগ্রাসন বন্ধের শর্ত দেওয়া হচ্ছে। 

ট্রাম্প আসলে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার জন্য তাঁর স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। ভুল পরিকল্পনা ও নিজের ইচ্ছায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে বিপর্যয়কর এই পরিণতির কথা মার্কিন ইতিহাসে হয়তো চিরকাল লিপিবদ্ধ থাকবে।

(লেখক: অ্যান্ড্রু গথর্প, অধ্যাপক, লাইডেন ইউনিভার্সিটি, নেদারল্যান্ডস)

আরও পড়ুন

×