ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বিবিসির বিশ্লেষণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়ে গেল

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়ে গেল
×

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৭:১৩ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৭:২২

চার মাসের ভয়াবহ যুদ্ধ। কত রক্ত, ধ্বংসলীলা। যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থ নানা প্রচেষ্টা। বহুবার আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত বিফল হওয়ার পর এবার মনে হচ্ছে, অন্তত একটি বিষয়ে একমত হতে পেরেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সেটি হলো একটি ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া স্মারক’ (এমওইউ) চূড়ান্ত করতে পেরেছে বৈরী এই দুই দেশ। চূড়ান্ত একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে তারা। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানিয়েছে উভয় দেশ। শত্রুতা অবসানের এই ঘোষণার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন এ চুক্তিকে স্বাগত জানাচ্ছে; তখনও চুক্তিটির কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন-অনিশ্চয়তা।

চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে কেবলই একটি সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই চুক্তিটি একটি দারুণ মুহূর্ত। রোববার তিনি কেবল তার ৮০তম জন্মদিনই উদযাপন করেননি, বরং একই সাথে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্যও পেয়েছেন। যদিও দুই দেশের পক্ষ থেকে এই চুক্তির যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত যার যার নিজস্ব স্বার্থ এবং রাজনৈতিকভাবে মেনে নেওয়া সহজ এমন অংশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উভয় পক্ষের বর্ণনায় লেবাননের বিষয়টি স্পষ্টভাবে রয়েছে। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা এসেছে। তবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী না হওয়ায় তারা এটি মেনে চলবে কিনা তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়ে গেছে। সত্যি বলতে, এই চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি কেবলই একটি সূচনা মাত্র। এর মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে, যার মধ্যে ইরান কীভাবে তার পারমাণবিক উপকরণ ধ্বংস ও অপসারণ করবে- সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একমত হতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি নিজেই যেকোনো সময় ভেস্তে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালির সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও মর্যাদা নিয়েও উভয়পক্ষের মধ্যে এখনও স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ সচল করার সময়সূচির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে মিল নেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, হরমুজ প্রণালি এখন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। রোববার ট্রাম্প উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো টোল বা বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের সব জাহাজ, তোমাদের ইঞ্জিন চালু কর। তেলের প্রবাহ চলতে দাও!’ 

তিনি ঘোষণা করেন, অতীতের আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার সম্পূর্ণ বিপরীতে তিনি একটি ‘দুর্দান্ত চুক্তি’ নিশ্চিত করেছেন যা ‘সমগ্র অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা’ বয়ে আনবে। অবশ্য ট্রাম্পের জন্য এমন অতিরঞ্জিত কথা নতুন কিছু নয়। গত বছরের গাজা যুদ্ধ অবসানের চুক্তি নিয়ে তার ঘোষণাগুলো- যেমন ‘অনন্তকালের শান্তি’ এবং ‘বিশ্বাস, আশা ও ঈশ্বরের যুগের সূচনা’- একইভাবে ঢালাও ছিল। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি তার মন্তব্য থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে।

উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক চুক্তিগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতা সাধারণত খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আর এই চুক্তির ক্ষেত্রে, সেই খুঁটিনাটি তথ্যের বেশ ঘাটতি রয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ইরান যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা ‘এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে’। যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মানার বিষয়টি যাচাই করতে পারবে। তা সত্ত্বেও কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যেমন- ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে এবং ইরানের কাছে বর্তমানে থাকা উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের শেষ পর্যন্ত কী হবে?

এর কিছু অংশ নিশ্চিতভাবেই বর্তমান যুদ্ধবিরতির ৬০ দিনের বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে পরবর্তী আলোচনা এবং ‘প্রযুক্তিগত’ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। কিন্তু ইরানকে তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি করানো এবং বাধ্য করার কয়েক দশকের প্রচেষ্টার পর যদি কোনো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে থাকে, তবে তা হলো- যুক্তরাষ্ট্র এই ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া স্মারক’ এ যা-ই নিশ্চিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করুক না কেন, এখানে কোনো কিছুরই শতভাগ নিশ্চয়তা নেই।

এই বিষয়টিকে আরও জোরালো করতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ রোববার একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘স্মারকের অধীনে অপর পক্ষের (যুক্তরাষ্ট্র) প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের পরই কেবল চূড়ান্ত আলোচনা শুরু করা হবে।’ সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আসলে কী এবং ইরান সেগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে- তার ওপরই মূলত নির্ভর করবে এই চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা।

জ্বালানি বাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে এখনই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ট্যাংকারের বিশাল জট দূর করা, মাইন অপসারণ, নিয়মিত তেল পরিবহন ও উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আরও বেশ কয়েক দিন বাকি থাকায় এর সাফল্য নিশ্চিত করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়ার সময় রয়েছে। তবে এটি ভেস্তে যাওয়ার মতো সময়ও কিন্তু রয়েছে। 

এর বাইরে আরেকটি বড় অনিশ্চয়তা হলো ইসরায়েল। এটি শুরু থেকেই মূলত একটি ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধ ছিল। রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, এই সপ্তাহ শেষে লেবাননে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার কারণে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের বিশ্বাস, এই হামলার ফলে প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া ইরান চুক্তিটি ভেস্তে যেতে পারত।

চুক্তিটি টিকে গেছে- অন্তত জনসমক্ষে ঘোষণা করার মতো যথেষ্ট সময় পর্যন্ত এটি বজায় ছিল। কিন্তু ইসরায়েল যদি লেবাননে পুনরায় নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরু করে, তবে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে যা, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। নিজের মন্তব্যে ভ্যান্সও এটি স্বীকার করেছেন যে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে এই যুদ্ধ অনেক আমেরিকানকে বেশ ভোগান্তিতে ফেলেছে। তিনি বলেন, আমেরিকান জনগণের প্রতি আমার প্রধান বার্তা হলো ‘ধন্যবাদ।’ সেই সাথে প্রতিশ্রুতি দেন যে, জ্বালানির দাম কমতে শুরু করবে। এটি কত দ্রুত ঘটে এবং আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া আমেরিকানদের জন্য সামগ্রিক ভোক্তা খরচ কত দ্রুত হ্রাস পায়- তার ওপরই মূলত নির্ভর করছে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের ওপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক চাপ কমবে কিনা।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান ক্রমবর্ধমান অসন্তুষ্ট জনগণের মুখোমুখি হচ্ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৬৩ শতাংশ আমেরিকান অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ৫৭ শতাংশ মনে করছেন,  অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে, ন্যূনতম পক্ষে এই চুক্তিটি চলমান দ্বন্দ্ব থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপের কিছুটা হলেও উপশম করবে, যদিও তা সম্পূর্ণ দূর করতে পারবে না। যদি পেট্রোলের দাম সত্যি সত্যিই কমতে শুরু করে, তবে তা আমেরিকানদের জন্য পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাওয়ার একটি দৃশ্যমান লক্ষণ হতে পারে।

এটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। যদিও ট্রাম্পের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো আপাতত অপূর্ণই রয়ে গেছে। দেশের মাটিতে তিনি এখনও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
 

আরও পড়ুন

×