দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
সমঝোতা চুক্তিতে কি মূল সমস্যার সমাধান হবে
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না, বলছেন বিশ্লেষকরা
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০০:২২
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার খবর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে অনেকের মনে রয়ে গেছে সংশয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমঝোতা চুক্তি অস্থির অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের জটিল সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। এটি নতুন সংঘাতের আশঙ্কাকে সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ মাত্র।
১৫ সপ্তাহব্যাপী সংঘাতের সময় ইরানের ড্রোন হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল কুয়েত। দেশটির বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী প্রকৌশলী ইয়াদ জুম্মা বলেন, এই চুক্তি হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত করবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উত্তেজনার মূল সমস্যা কতটা সমাধান করতে পারবে, তার ওপর।
চুক্তির ঘোষণার পর দ্য গার্ডিয়ান বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের কেউই মনে করেন না, আগামী শুক্রবার সই হতে যাওয়া এই সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারবে। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘এটি মূলত বড় একটি ব্যান্ডেজের মতো। আবারও যে কোনো সময় সংঘাত ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।’
সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে। অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, এত স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব জটিল বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধান পাওয়া কঠিন।
তারা মনে করিয়ে দেন, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রায় ১৮ মাস সময় লেগেছিল। সেই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি মেনে নেওয়ার বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল ইরান। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে চুক্তিটি বাতিল করেন।
নতুন চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে আবারও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছে। যদিও ইসরায়েল এতে অসন্তুষ্ট। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
গাজার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু এরপর থেকে প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখলে রেখেছে ইসরায়েল। হামাস অস্ত্র ছাড়েনি। চুক্তির দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তেমন অগ্রগতি হয়নি।
এই চুক্তি নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে ইসরায়েলে। কারণ এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা তথাকথিত অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সকে (প্রতিরোধের অক্ষ) দেওয়া সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই অক্ষ বা জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসবিদ ড্যানি অরবাখ বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছে ইসরায়েল। দেশটির লক্ষ্য, অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স যেন আর কখনও দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু ৭ অক্টোবরের স্মৃতি মুছতে বহু বছর লাগবে। তাই এই অবস্থানও দ্রুত বদলাবে না।
চুক্তির খবরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা অনুভব করছে উপসাগরীয় সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি সাম্প্রতিক সংঘাতে নড়বড়ে হয়ে গেছে। ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বেসামরিক অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে মাস বা বছর লেগে যেতে পারে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এইচ এ হেলিয়ার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও আক্রমণাত্মক ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল খুঁজবে। তারা আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারবে না– এ ব্যাপারে সবাই একমত। তবে ভবিষ্যতে কী কৌশল নেওয়া হবে, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইরান যেভাবে অঞ্চলজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে, তা নিয়ে আরব বিশ্বের উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু নতুন চুক্তিতে এসব প্রশ্নের সমাধান নেই।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইরান
- সমঝোতা চুক্তি
