ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতিই কি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ?

সাত বছরের মধ্যে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্য

অর্থনীতিই কি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ?
×

ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৫:১৩

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে চিরচেনা পালাবদল। গত সাত বছরের মধ্যে এবার ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট। প্রতিনিয়ত মসনদ বদলালেও বদলাচ্ছে না আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট। দেশটির দীর্ঘস্থায়ী ও অনমনীয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে বিদায় নিতে হচ্ছে একের পর এক প্রধানমন্ত্রীকে। এখন ভঙ্গুর অর্থনীতি আর জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের চাপই ব্রিটিশ রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণের মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার মাত্র দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তাঁর চার পূর্বসূরি ঋষি সুনাক, লিজ ট্রাস, বরিস জনসন এবং তেরেসা মে– সবাইকে প্রায় একই ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং তাদেরও মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। বিশেষ করে লিজ ট্রাসের দুই মাসেরও কম মেয়াদের শাসনকালে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। তাঁর ঘোষিত অবাস্তব কর ছাড়ের পরিকল্পনার জেরে যুক্তরাজ্যের আর্থিক বাজারে ধস নামে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড জরুরি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলেও বন্ড মার্কেটের নজিরবিহীন চাপ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।

রাজনীতিবিদদের প্রতি ভোটারদের সন্তুষ্টি মূলত নির্ধারিত হয় তাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে মানুষের গড় সাপ্তাহিক আয় ১ শতাংশেরও কম বেড়েছে, যা ২০১৯ সালের পর থেকে হওয়া প্রবৃদ্ধির তুলনায় সামান্যতম উন্নয়নও নয়। একই সঙ্গে করের বোঝাও গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুর্বল অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের কারণেই জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কিয়ার স্টারমার এবং তাঁর আগের চার নেতাই যুক্তরাজ্যের নিম্ন প্রবৃদ্ধিকে প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের অধরাই রয়ে গেছে। সরকারের ঋণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় একের পর এক প্রশাসন জরাজীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার বা আবাসন সংকটের মতো দীর্ঘায়িত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ২০১৬ সালে তেরেসা মে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল বছরে গড়ে মাত্র ১ শতাংশ। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিমাপের অন্যতম সূচক মাথাপিছু জিডিপিও ছিল একই রকম হতাশাজনক।

এর আগে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনামলে ব্রেক্সিট, করোনা অতিমারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের ফলে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই বিষণ্ণতার কারণেই ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি জয় পায়। তবে ক্ষমতায় আসার পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে মানুষের মোহভঙ্গ ঘটে এবং ফলস্বরূপ, গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় বিপর্যয় ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টারমার যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে একটি নিস্তেজ অর্থনীতি পেয়েছিলেন, তাঁর আসন্ন উত্তরসূরিও একই সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আগের অনুমানের চেয়ে অনেক কম।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদি সত্যিই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হয়, তাহলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীকে জীবনযাত্রার মান রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

×