আলোচনা সভায় আনু মুহাম্মদ
সরকার বদলালেও নীতিনির্ধারক বদলায় না
বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই
আনু মুহাম্মদ। ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৫:০১
দেশের সরকার পরিবর্তন হলেও বাজেট প্রণয়নের নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সরকার বদলালেও নীতিনির্ধারক বদলায় না। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া এখনও আমলা, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো বিদেশি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এ সভার আয়োজন করে।
সভাপতির বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, নারী, শিক্ষার্থী বা শিক্ষক; কারও কোনো অংশগ্রহণ নেই। তাহলে এই বাজেট কীভাবে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়?
উন্নয়ন দর্শনের সমালোচনা করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকারের দর্শনের কোনো পার্থক্য নেই। প্রকৃত উন্নয়ন দর্শনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রেণিগত, লৈঙ্গিক, জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্য কমানো এবং এর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জনগণ।
তিনি বলেন, নয়া উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন দর্শনে মানুষের শিক্ষা-চিকিৎসার সুযোগ নেই; জাতীয় সক্ষমতা ও নিরাপত্তা অবহেলিত। জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো পদক্ষেপ নেই; স্কুলগুলোতে শ্রেণিকক্ষ নেই; শিক্ষক নেই। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার নেই, চিকিৎসা সামগ্রী নেই। এসব সংকট সমাধানে কোনো আগ্রহ নেই। অথচ সরকার কেনাকাটা আর প্রকল্পের নামে লুটপাটে খুব আগ্রহী।
সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ ধার্যের সমালোচনা করে বলেন, গত বছর ৪২ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবলে সরকার নিশ্চয় ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার করে বিদ্যুতের দাম কমাতে পারত। তা না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত বোঝা বহন করেও মানুষকে সারাদেশে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ৮৪ শতাংশ লোডশেডিংই হয় গ্রামাঞ্চলে। অথচ সরকার বলছে, এই বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, সরকার এই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে যাত্রা’ বলছে। অথচ আমরা দেখেছি এ বাজেট পুরোপুরি আমলানির্ভর। বাজেটে বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ জনগণের প্রায় অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। গণতান্ত্রিক করতে হলে বাজেটকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, এ বছর হামে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সাতশ! অন্তবর্তী সরকারের টিকা কেনায় অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের চিকিৎসায় অবহেলারই পরিণাম এটা। শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। অথচ আমাদের সরকার চিকিৎসার দায়কে ধীরে ধীরে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য লেখক-গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ বলেন, কাঠামোগত সমস্যার প্রধান সমস্যা সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে বাজেট সংক্রান্ত তথ্য সজলভ্য না হওয়া। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য বাজেট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। বাজেট হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য ও পাণ্ডিত্যের ব্যাপার। বাজেটকে জনগণের জন্য বোধগম্য করে তোলা দরকার। দ্বিতীয় সমস্যা বাজেটের রাজনৈতিক ব্যবহার। রাজনৈতিক স্বার্থেই জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়।
চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান বলেন, সাংস্কৃতিক বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক প্রকল্পগুলো হয় আমলানির্ভর ও জনবিচ্ছিন্ন। এই বাজেটের বড় অংশই আমলাদের পেছনে খরচ হচ্ছে। সাংস্কৃতিক চর্চায় ব্যয় যৎসামান্যই। প্রান্তিক মানুষের সাংস্কৃতিক চর্চার উদ্যোগ খুবই কম। সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ ও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ডা. সুরাইয়া ইয়াসমিন পলি বলেন, ৪৬টি খাতে জেন্ডার বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হলেও এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার স্থাপন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা জরুরি। সরকারি হাসপাতালে প্রসবকালীন চিকিৎসা বিনামূল্যে নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা দরকার। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রসবকালীন চিকিৎসার খরচ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
